স্টাফ রিপোর্টার
কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব আর কৃষিনির্ভর আয়ের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে বিদেশমুখী হচ্ছেন সিরাজগঞ্জের যমুনাপাড়ের মানুষ। বেকারত্বের অভিশাপ দূর করতে জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার নারী-পুরুষ প্রতিবছর পাড়ি জমাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়া এসব প্রবাসী কর্মীর পাঠানো আয় যেমন তাদের পরিবারের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে, তেমনি চাঙ্গা রাখছে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিকে। তবে সম্ভাবনার এই দুয়ার খোলার পাশাপাশি দালালচক্রের প্রতারণা ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়ছে সমানে।
নিবন্ধনে রেকর্ড, বাড়ছে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা:
সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্যমতে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে সিরাজগঞ্জ থেকে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৮০৩ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন।
বিশেষ করে ২০২৫ সালে বিদেশ যাওয়ার আগ্রহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ওই এক বছরেই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন ১০ হাজার ৩৮২ জন, যাদের মধ্যে ১০ হাজার ২০২ জন পুরুষ এবং ১৮০ জন নারী। একই বছর কাজের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ১০ হাজার ৪৯৪ জন কর্মী (১০,০৫৭ জন পুরুষ ও ৪৩৭ জন নারী)।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকা এবং বিদেশে তুলনামূলক বেশি উপার্জনের সুযোগই তরুণ সমাজকে প্রবাসমুখী করে তুলছে।
রেমিট্যান্সে সচল স্থানীয় অর্থনীতি:
প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল অর্থ সিরাজগঞ্জের গ্রামীণ ও শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিরাজগঞ্জ জেলায় রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৫.১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৫৮ কোটি টাকার প্রবাসী আয় আসছে এই জেলায়।
এই রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনে খরচ হলেও বাকি অংশ বিনিয়োগ হচ্ছে জমি কেনাবেচা, ঘরবাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে। ফলে স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা ও লেনদেন আশাতীত হারে বেড়েছে।
দালালচক্রের ফাঁদ ও অনিশ্চয়তা:
বিদেশযাত্রার এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে রয়েছে প্রতারণা ও নিঃস্ব হওয়ার করুণ গল্প। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জেনে স্থানীয় দালালদের ওপর নির্ভর করেন।
ভিটেমাটি বিক্রি কিংবা এনজিও ও ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালালের হাতে তুলে দেন অনেকে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে দেখা যায় প্রতিশ্রুত চাকরি বা বেতন নেই, কিংবা থাকতে হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের পরিবেশে। আবার অনেকে ভিজিট ভিসায় গিয়ে আইনি জটিলতায় পড়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন।
বিদেশফেরত কর্মী মো. বাবু মালা বলেন, “দালালরা ভালো কাজ আর মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে বড় অঙ্কের টাকা নেয়। কিন্তু বিদেশে গিয়ে সেই কথা মিল পাওয়া যায় না। অনেকেই প্রতারিত হয়ে চরম বিপদে পড়েন।”
প্রয়োজন নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসন:
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতারণা এড়াতে সরকারি নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া জরুরি।
সিরাজগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মু. আব্দুল হান্নান জানান, প্রবাসীরা দেশের একেকজন ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’।
তিনি বলেন, “দালালের ওপর নির্ভর না করে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আবশ্যক। বিদেশ যাওয়ার আগে চাকরির শর্ত, বেতন ও ভিসার তথ্য যাচাই করলে প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। আমরা প্রবাসগামীদের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।”
সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স যে মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, তা ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার তথ্য থেকেই স্পষ্ট। তবে এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে অবৈধ দালালচক্র দমন, দক্ষ কর্মী তৈরি, বিদেশফেরতদের পুনর্বাসন এবং সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।