শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
পরীক্ষা নয়, এবারও ফলের ভিত্তিতে একাদশে ভর্তি এমন বিভেদ চললে শেখ হাসিনা তালি বাজাবেন : রিজভী আওয়ামী লীগ বিদেশ থেকে উঁকিঝুকিঁ দিচ্ছে, তৎপরতার মুরোদ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাজীপুরে ভূমি অফিসে ডিসি’র আকস্মিক অভিযান, চার কর্মকর্তা বরখাস্ত ছাগল–কাণ্ডের মতিউরের দুর্নীতি মামলার বিচার শুরু সম্মিলিত অংশগ্রহণেই পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী সমকামিতার অভিযোগ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধিতে কী আছে ক্ষেত থেকে ভোক্তা, কাঁচা মরিচের কেজিতে বেড়ে যাচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা দুবাইয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বেনজীর নতুন ডিএজি-এএজিদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান অ্যাটর্নি জেনারেলের

ক্ষেত থেকে ভোক্তা, কাঁচা মরিচের কেজিতে বেড়ে যাচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা

  • আপডেট সময় সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩.১৩ পিএম

টিডিএস ডেস্ক॥



এক কেজি কাঁচা মরিচ কৃষক বিক্রি করছেন একশ থেকে দেড়শ টাকায়; উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের আড়তে দাম পড়ছে ২০০ টাকার মতো; পাইকারদের কিনতে হচ্ছে আড়াইশ থেকে ৩০০ টাকায়; আর খুচরা ক্রেতাদের হাতে যখন যাচ্ছে, দাম উঠে যাচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা।

অর্থাৎ, ক্ষেত থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে এক কেজি কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে যাচ্ছে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা।

ঢাকাসহ দেশের পাঁচ জেলার বাজার বিভিন্ন পর্যায়ের দাম বিশ্লেষণ করে এ ব্যবধান পাওয়া গেছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্যপণ্যটির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ভারি বৃষ্টিতে আবাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা সামনে আনছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। আগে থেকে মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়া থাকলে বর্তমান সংকট এড়ানো যেত বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে কাঁচা মরিচের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬ লাখ টন। উৎপাদন হয় সাড়ে ৭ লাখ টনের মতো।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হলেও দেশে প্রতিবছরই এক বা একাধিকবার কাঁচা মরিচের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এর মূল কারণ, পণ্যটি পঁচনশীল। আর সিংহভাগ মরিচই উৎপাদন হয় শীতকালে।

অন্যদিকে জুলাই-অগাস্টের দিকে বাজারে কাঁচা মরিচের জোগান থাকে সবচেয়ে কম। এই সময়ের মেটাতে প্রতিবছরই সরকার বেসরকারি খাতকে মরিচ আমদানির অনুমতি দেয়, যার সিংহভাগ আসে ভারত থেকে। কিন্তু এবছর আমদানি না হওয়ায় মরিচের দাম চড়ছে। যদিও দাম ৪০০ টাকার ঘরে উঠে যাওয়ায় রোববার মরিচ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার।

কোথায় কত বাড়ছে দাম?

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের হাজারি পল্লির কৃষক খন্দকার মিজানুর রহমান প্রতিবছরের মতো এবার পাঁচ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। কিন্তু বর্ষার কারণে তিন ভাগের এক ভাগ মরিচ নষ্ট হয়ে গেছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রতিবছর ২০০ থেকে ২৫০ মন মরিচ বিক্রি করি। এ বার বর্ষার পানিতে পুরোটাই ডুবে গেছে। এছাড়া বর্ষার আগেও মরিচ গাঁছে অসুখ আসছিল। এটারও কারণেও এবছর মরিচ কম হয়েছে। বাকি যেগুলো ছিল, সেগুলো বর্ষার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বর্ষার পানিতে পুরোটাই শেষ। আমার না শুধু, সবারই।

“গেল বছর ২০ টাকা, ৫০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। স্থানীয় আড়তদারদের কাছে বিক্রি করি। এই সময় কেজি ১১০ টাকা ১২০ টাকা বিক্রি করছি।”

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মরিচ চাষি রোকনউজ্জামান বলেন, “টানা ভারি বৃষ্টিতে আমার পুরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। সব গাছ পঁচে গেছে।

“হাটে কিছু মরিচ এনে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পাচ্ছি, কিন্তু ক্ষেতে তো মরিচই নাই। দাম বাড়লেও আমাদের কোনো লাভ হচ্ছে না।”

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকামে মরিচ নেই। ক্ষেত থেকে যা আসে, তা স্থানীয় চাহিদাও মেটাতে পারছেন না।

মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা মহাসড়েকের পাশেই বসে ‘জাগীর বাজার’ যেখানে আশপাশের এলাকার কৃষকরা শাকসবজি নিয়ে হাজির হন।

এখানকার ‘মোল্লা অ্যান্ড সন্স’ এর মালিক রাজ্জাক বলেন, “মরিচ গাছ ডুবে গেছে। বন্যা না হলও বর্ষায় সব জায়গায় পানি। ২০-২৫ দিন ধইরা মাল আসে না। সব মিলায় এক-দেড়শ কেজি আসে। স্থানীয়রাই নিয়া যায়।”

এখন আড়তে কত করে বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ী মাল পাঠাই। মাসে খানেক আগে ৪০ থেকে ৫০ কেজি দরে পাঠাইছি; ৩০ টাকাও আছিল। এখন নাই বলে দাম বেশি। মান বুঝে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম।”

এ বছর পেঁয়াজ উৎপাদনেও বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। আমাগী মাসের মাঝামাঝি থেকেই এই পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলেন মনে করছেন গ্রামের এই আড়তদার।

সিরাজগঞ্জ পৌর কাঁচাবাজার সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হযরত আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বাজারে কাঁচা মরিচের জোগান অনেক কমে গেছে।

তিনি বলেন, “সিরাজগঞ্জের আড়তে রোববার এক কেজি মরিচের পাইকারি দর ছিল মানভেদে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।”

কাঁচা মরিচের দাম নিয়ে কথা হয় বগুড়ার মহাস্থানগড় হাটের স্থানীয় আড়তদার করিম আলীর সঙ্গে।

তিনি বলেন, “আমাদের আড়তে প্রতিদিন শত শত মণ কাঁচা মরিচ আসত, এখন চাষিরা ১০ থেকে ১৫ কেজির বেশি আনতে পারছেন না।”

“বাজারে যখন মাল কম থাকে, তখন পাইকারদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। আমরা প্রতি কেজিতে সামান্য কমিশন রেখে ঢাকার বড় বেপারীদের ট্রাকে মাল তুলে দিচ্ছি।”

ঢাকার বাজারে কী পরিস্থিত?

কারওয়ান বাজারের আড়তদার কাওসার উদ্দিন বলেন, কুষ্টিয়া, যশোর ও মানিকগঞ্জ থেকে কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ট্রাক মরিচ আসত। এখন আসে ৪ থেকে ৫ ট্রাক।

“সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমরা চাইলেও দাম কমাতে পারব না।”

দুই কারণে কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে বলে মনে করেন রায়ের বাজারের সাদেক খান কৃষি মার্কেটের ‘ছালাম এন্টারপ্রাইজের’ মালিক আব্দুস ছালাম।

তিনি বলেন, “বর্ষার কারণে মরিচ গাছ পঁচে গেছে। আড়তে খুব কম মরিচ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আড়তেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।”

কারওয়ান বাজারের আড়ত থেকে মরিচ কেনার রশিদ দেখিয়ে তিনি বলেন, “মরিচ অল্পই পেয়েছি। ১০ কেজি মরিচ কিনলাম ২৬০০ টাকায়। কেজি পড়েছে ২৬০ টাকা। মান একটু কম হলে পড়ছে ২৪০ টাকা।

“আরেকটা বিষয় হলো, আমাদানি নাই। ভারত থেকে আমদানি হলে এত দাম বাড়ত না। আমদানি না থাকার সুযোগেও দাম বাড়ানো হচ্ছে।”

রোববার দুপুরে সাদেক খান কৃষি মার্কেট থেকে সবজি কিনছিলেন খুচরা বিক্রেতা রহমান মিয়া। সঙ্গে এক পাল্লা (৫ কেজি) কাঁচামরিচও কেনেন তিনি।

মোহাম্মদপুর টাউন হলের খুচরা বাজারের এই বিক্রেতা বলেন, “দাম বেশি হওয়া ১৫০০ টাকা দিয়ে পাল্লা কিনলাম।”

অর্থাৎ, প্রতিকেজি দাম পড়েছে ৩০০ টাকা।

দুপুর তিনটায় টাউন হলে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, খুচরা বিক্রেতারা মানভেদে এক কেজি মরিচের দাম চাইছেন ৩২০ থেকে ৩৬০ টাকা।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের দৈনিক বাজার দর বলছে, মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে ২১৮ শতাংশ।

এক মাস আগে প্রতিকেজি মরিচের দাম ছিল ৮০ থেকে ১৪০ টাকা; রোববার বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। এক সপ্তাহে আগে দাম ছিল ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

সরবরাহ কমে গেলেও মরিচের এই দামকে অস্বাভাবিক মনে করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল।

তিনি বলেন, “কাঁচা মরিচ গাছ অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। এ জন্য বর্ষায় বেশির ভাগ ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময়টা কাঁচামরিচ ও টমেটোর জন্য অনুকূল নয়। এই সময় কিছু কাঁচা মরিচ আমদানি করার দরকার পড়ে।

“কিন্তু তাই বলে ৪০০ টাকা! মরিচের দাম ৪০০ টাকা পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে হলেও বাংলাদেশ বা এশিয়া মহাদেশে এত দাম হওয়ার সুযোগ নেই।”

মৌসুমের বাইরে মরিচ ও টমেটো উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ

সারাবছর কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে সরকার।

ওবায়দুর রহমান বলেন, “আজকেই সরকারের কাছে পরিকল্পনা পাঠিয়েছি আমরা। আগামী বছর থেকে প্রায় ১ কোটি বস্তা কৃষকদেরকে দেওয়া হবে। বাড়িতেই মরিচ চাষ করতে পারবেন কৃষকরা; প্রণোদনার প্যাকেজ তৈরি করেছি।”

বস্তায় মরিচ চাষের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে বস্তায় চারা রোপণ হবে। এগুলো এমন বস্তা, যেখানে পানি জমে থাকবে না। বৃষ্টি যতই পড়ুক, বস্তার পানি বের হয়ে যাবে।”

আরেকটা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মাটিতে পলিথিনটা বিছিয়ে দেওয়া হবে। পলিথিনের উপর দিয়ে পানি চলে যাবে। এটাকে বলে পলিমার।

“আমাদের চারশর মতো পলিনেট হাউস আছে। পলিহাউসগুলোতে আমরা আগামী বছর কাঁচা মরিচ এবং টমেটো উৎপাদনে নিয়ে যাব। তার কারণে বৃষ্টির সময়েও কাঁচামরিচ ও টমেটোর প্রোডাকশনে অসুবিধা হবে না।”

তার ভাষ্য, “একইভাবে বর্ষায় কাঁচা মরিচ চাষ করে যদি আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারি, তাহলেই দাম নিয়ে আমাদের আর সংকট তৈরি হবে না।”

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com