বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন

ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় বেড়ে ২ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা

  • আপডেট সময় রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭.১৩ পিএম

স্টাফ রিপোর্টার:



রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুরুতে মেগা প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর দরবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ব্যয়ের সংশোধিত প্রস্তাব দাঁড়াবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত এ সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটি (আরডিপিপি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পরিকল্পিত এ দুটি প্রকল্পের একটি হলো এমআরটি লাইন-১, যা বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পাতালপথে এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত উড়ালপথে সমন্বিতভাবে নির্মিত হবে। অন্যটি হলো এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর), যা সাভার থেকে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন, “রাজধানী ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই।” ব্যয়ের বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, শুরুতে পূর্ণাঙ্গ নকশা না থাকা এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ নকশা প্রণয়নের পর ব্যয়ের পরিধি বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্প বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে নির্মাণ খরচ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

২০১৯ সালে যখন এই দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন এমআরটি লাইন-১-এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নতুন প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায়। এর ফলে পাতাল ও উড়াল মিলে ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের পেছনে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত বাজেট ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা, যা বর্তমানে সংশোধন করে ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এ বাজেট অনুমোদিত হলে এ লাইনে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হবে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।

ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ডলারের মূল্যের বড় ধরনের পরিবর্তন এবং স্থানীয় কর-ভ্যাটের নতুন হার বাজেটের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। ২০১৯ সালে মার্কিন ডলারের মিনিমাম বিনিময় হার প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরে বাজেটের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে প্রতি ডলারের দর প্রায় ১২২ টাকা ধরে হিসাব করতে হচ্ছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ, নতুন করে ইউটিলিটি সার্ভিস স্থানান্তরিত করা, পরামর্শক ফি ও নির্মাণকালীন সুদের কারণেও সার্বিক খরচ বেড়েছে।

জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্প দুটির ব্যয় পর্যালোচনার জন্য সরকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি অনুসন্ধান শেষে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে রিপোর্ট জমা দেয়, যেখানে উল্লিখিত কারণে ব্যয়বৃদ্ধিকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শামীম জেড বসুনিয়া জানান, বছরে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৩৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং অবকাঠামোগত নকশায় পরিবর্ধনের ফলে এই বাড়তি খরচ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে।

তবে অবকাঠামো বিশ্লেষক ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক ঠিকাদারি প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবকে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন যে, ঋণদাতা সংস্থা জাইকার কিছু কঠিন শর্তের কারণে দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত থাকে, যা পরোক্ষভাবে চুক্তিভিত্তিক খরচ বাড়িয়ে দেয়। সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থার সাথে দরকষাকষি করে এসব শর্ত শিথিল করতে পারে, তবে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে।

বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত জনপ্রিয় এমআরটি লাইন-৬ রুটে নিয়মিত ট্রেন চলাচল করছে এবং কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। নতুন এই দুটি লাইনের ডিপো উন্নয়নকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে বাড়তি ব্যয়ের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণের পরই চুড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com