বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪২ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
ব্যাংকে অডিট চলাকালে ম্যানেজারের ‘আত্মহত্যা’, নেপথ্যে কী? থানায় ৩ অডিট সদস্য শাহজাদপুরে কোটি টাকার খাস জমি জবরদখল: অভিযান চালিয়ে সরঞ্জাম জব্দ করল প্রশাসন ১৭ বছরে অর্থনীতি ধ্বংস করে গেছে স্বৈরাচার, পুনরুদ্ধারে লড়ছে সরকার: শামা ওবায়েদ নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হলেন কোয়েল মল্লিক গরু ‘চুরি’ করে ছেলের বউভাত: গ্রেপ্তার বাবা ২০৩০ সালের মধ্যে শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হতে পারে বাংলাদেশ: ইইউ রাষ্ট্রদূত জামিন নামঞ্জুর, আখতারুজ্জামান কারাগারে ২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২৫২ টাকা রাজধানীর বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সওজের মদ্যপ প্রকৌশলীকে ঘিরে বিতর্ক, সরকারের ভাবমূর্তি  ক্ষুন্নের অভিযোগ

নানামুখী অপরাধে শঙ্কিত ঢাকাবাসী

  • আপডেট সময় শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬.৪৫ পিএম
এআই-এর মাধ্যমে তৈরি ছবি
  • দুই মাসে রাজধানীতে ৫৪ খুন
  • অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাং
  • রোধ করা যাচ্ছে না ছিনতাই
  • আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ


রাজ মোস্তফা



রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রকাশ্যে ছিনতাই, দিনের আলোয় গুলি করে হত্যা, খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনলাইনেও বাড়ছে নিত্যনতুন ধরনের সাইবার অপরাধ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ সুযোগে অপরাধী চক্রের তৎপরতা নতুন করে বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় অপরাধের সূচক বেশি

রাজধানীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বৈশ্বিক তথ্য ও পরিসংখ্যানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম নাম্বিওর ২০২৬ সালের ক্রাইম ইনডেক্স অনুযায়ী, ঢাকার অপরাধ সূচক ৬২ দশমিক ২ এবং নিরাপত্তা সূচক ৩৭ দশমিক ৮। দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অপরাধ সূচক সর্বোচ্চ বলে ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম্বিওর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক তালিকায় অপরাধ সূচকের দিক থেকে ঢাকার অবস্থান ৫৯তম। তবে নাম্বিওর সূচক মূলত ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্য ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি সূচক; এটি কোনো দেশের সরকারি অপরাধ পরিসংখ্যানের বিকল্প নয়।

বাড়ছে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতন

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনেও নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

এমএসএফের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মাসে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার মোট ঘটনা ছিল ৩০৬টি। জুনে এ সংখ্যা ছিল ৩২০। তবে একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুনে ৬৮টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০টিতে।

এ ছাড়া যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা জুলাইয়ে ২২টিতে দাঁড়ায়। আত্মহত্যার ঘটনাও ১৭ থেকে বেড়ে ২৮টিতে পৌঁছায়।

তবে কিছু গুরুতর অপরাধের ঘটনা কমেছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৬ থেকে কমে সাতটি, শারীরিক নির্যাতন ৫৬ থেকে ৪২টি এবং হত্যার ঘটনা ৭৬ থেকে ৫২টিতে নেমেছে।

ছিনতাই ঠেকানো যাচ্ছে না

রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। গত রোববার উত্তরায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সোয়া কোটি টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি বিভাগে বর্তমানে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭। ছয় মাস আগে এ সংখ্যা ছিল ৯৮৯। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বর্তমানে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের বিরুদ্ধে এক থেকে সাতটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। অনেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।

গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তালিকাভুক্তদের বাইরে রাজধানীতে আরও এক হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় থাকতে পারে। তাদের মধ্যে ভাসমান কিশোর ও মাদকাসক্তদের একটি অংশ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

রাজধানীতে তিন শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তেজগাঁওয়ে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের হটস্পট রয়েছে। এরপর রয়েছে মতিঝিল ও ওয়ারী।

তবে এসব এলাকা চিহ্নিত করার পরও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি সফল না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও তৎপরতা নিয়ে। অনেক ভুক্তভোগী মামলা বা সাধারণ ডায়েরি না করায় প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাং

রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং নেতা হিসেবে পরিচিত আকাশ ১২টি মামলার আসামি। সাতবার গ্রেপ্তারের পর প্রায় আট মাস আগে জামিনে বের হয়ে সে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বলে পুলিশের অভিযোগ। চাপাতি ও সামুরাই দিয়ে হামলা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে সম্প্রতি তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে আকাশ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের ১৭৩টি চক্র ছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ২৩৭টিতে দাঁড়ায়। পুলিশের নথিতে এসব চক্রের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৩৮২ জন। এর মধ্যে রাজধানীতে এখনো ১২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এসব চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইভ টিজিং, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অধিকাংশ মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় অভিযুক্তদের দীর্ঘ সময় আটক রাখা সম্ভব হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় জামিনের সুযোগ তৈরি হয়।

তার ভাষ্য, এসব মামলায় অনেক সময় সাধারণ সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।

“শিশুদের জন্য আলাদা আদালত করা হলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে,” তিনি বলেন।

দুই মাসে রাজধানীতে ৫৪ খুন

রাজধানীসহ সারা দেশে হত্যাকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলা ও হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর দুটি স্থান থেকে দুই ব্যক্তির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া পেশাদার খুনিদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই মাসে রাজধানীতে ৫৪টি এবং সারা দেশে ৬২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

বাড়ছে মব সহিংসতার প্রবণতাও

আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জুনে সারা দেশে অন্তত ৭৮টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৩৩ জন নিহত এবং ১২৬ জন গুরুতর আহত হন।

এর আগের মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২ এবং আহত ৭১। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এমএসএফের জুনের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩০৩ জন আহত এবং দলীয় সংঘর্ষে সাতজন নিহত হওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক সহিংসতার প্রবণতা অব্যাহতভাবে বাড়ছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, রাজধানীর কিছু এলাকায় অপরাধীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অপরাধী নেটওয়ার্কের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব সময় তাল মেলাতে পারছে না।

কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।

“কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে,” তিনি বলেন।

রাজধানীতে অপরাধের বহুমুখী বিস্তার—ছিনতাই, হত্যাকাণ্ড, কিশোর গ্যাং, যৌন সহিংসতা, মব সহিংসতা ও সাইবার অপরাধ—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার নয়, কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা, অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ এবং সামাজিক প্রতিরোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com