পদোন্নতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেমে থাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে ৪১টি উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর (সিভিল) পদ এবং তড়িৎ ও যান্ত্রিক শাখায় ৩১টিতে পদ শূন্য রয়েছে
টিডিএস ডেস্ক॥
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়া প্রকৌশলীদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে দুই পক্ষের রিট মামলার কারণে আটকে আছে শতাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতি।
একই পঞ্জিকাবর্ষে বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া এবং পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিরোধ ২০২৫ সালের শুরুতে আদালতে গড়ায়। সেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না দেখে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
এ কারণে পদোন্নতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেমে থাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরে ৪১টি উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর (সিভিল) পদ এবং তড়িৎ ও যান্ত্রিক শাখায় ৩১টিতে পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা শতাধিক।
কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও মামলা জটিলতার বিষয়টি দেখভাল করেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম। তিনি বলেন, “১৯৭০ সালের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সাধারণ নীতিমালার একটি ধারার ভিত্তিতে একই পঞ্জিকাবর্ষের শুরুতে যারা আগে যোগদান করেন, তারাই জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আগে থাকেন। বিভিন্ন কারণে জ্যেষ্ঠতার তালিকা গঠনসহ পদোন্নতি আটকে যায়।
“প্রায় ৫ বছর ধরে পদোন্নতি আটকে থাকার পর ২০২৫ সালে দুই পক্ষই রিট অবেদন করেন। নন ক্যাডারদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে হাই কোর্টের একটি স্থগিতাদেশ রয়েছে বলেই পদোন্নতির বিষয়টি এগোনো যাচ্ছে না। এছাড়া আরো দুই-তিনটি বিষয়ের কারণে এ তালিকা চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।”
মামলার কারণে তালিকা প্রণয়নে দেরি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিষয়টির সমাধান না হওয়ায় ৮০টির মত পদ খালি। সেখানে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যাচ্ছে না।
“এতে কাজের ক্ষতি হচ্ছে; অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কারণে অনেক কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্বের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।”
এখন সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা একশর বেশি বলে জানান তিনি।
সারোয়ার বলেন, “এক পক্ষকে পদোন্নতি দিলে অন্যরা আবার মামলায় চলে যাবে। যেহেতু তারা আদালতে গেছে, সেখান থেকেই চূড়ান্ত রায় আসুক। তারপর সেভাবেই পদোন্নতি দেওয়ার কাজ করা হবে।”
পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা প্রকৌশলীরা বলছেন, পদোন্নতি প্রত্যাশী ৩৭ থেকে ৪৪তম বিসিএসের গণপূর্ত ক্যাডারের কর্মকর্তারা এ পদের জন্য উপযুক্ত হয়ে আছেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণে ৩৭তম বিসিএসের কর্মকর্তারা নব্ম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
এছাড়া ৩৮ বিসিএসের কর্মকর্তারা সাড়ে ৫ বছর ধরে একই পদে রয়েছেন। এ ব্যাচের কর্মকর্তারাও ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতিপ্রত্যাশী। এছাড়া নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও অনেকেই জ্যেষ্ঠতার তালিকা না হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২০ মার্চ ৩৭তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪৪ জন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পান। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর ২৫ জন উপসহকারী প্রকৌশলী পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হন।
দুই বছর পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ৬১ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং ৩২ জন সহকারী প্রকৌশলী (তড়িৎ ও যান্ত্রিক) নিয়োগ পান।
ওই বছরের ২ নভেম্বর ৩০ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং ২৩ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (তড়িৎ ও যান্ত্রিক) পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হন।
একই পঞ্জিকাবর্ষে সরাসরি নিয়োগ এবং পদোন্নতির মাধ্যমে পরবর্তী পদের দায়িত্ব পাওয়া প্রকৌশলীদের মধ্যে কারা জ্যেষ্ঠ হবেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
আগে ১৯৭০ সালের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সাধারণ নীতিমালার একটি ধারার ভিত্তিতে একই পঞ্জিকাবর্ষের শুরুতে যোগদানের তারিখ হিসাব করা হত। কিন্তু সেই নিয়ম মানতে রাজি না হয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করে আদালতে রিট আবেদন করেন বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি সহকারী প্রকৌশলী হওয়া একদল কর্মকর্তা।
হাই কোর্ট বিষয়টি আমলে নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। সেই তদন্ত শেষে কমিটি হাই কোর্টে প্রতিবেদন জমা দেয়।
সেখানে বলা হয়, অনুমোদিত ও বৈধ জ্যেষ্ঠতা তালিকা ছাড়াই বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রকৌশলীদের পদোন্নতি এবং জ্যেষ্ঠতা দেওয়ায় সরাসরি ক্যাডার থেকে আসা প্রকৌশলীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
হাই কোর্ট তখন ওই বিধিবহির্ভূত সুবিধা ও জ্যেষ্ঠতা প্রদানকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মতামত দেয়। মন্ত্রণালয়ের মত অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস জ্যেষ্ঠতা বিধিমালার ৩(ঙ) বিধানের ভিত্তিতে ক্যাডার পদে যোগদানের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
পরে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দেয়, সরাসরি ক্যাডার পদে আসা প্রকৌশলীরা যে তারিখে চাকরিতে যোগদান করেছেন, তারা পিছনের কোনো তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারবেন না।
আপিল বিভাগ দুই মাসের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য হাই কোর্টকে নির্দেশ দেয়। পরে রিটকারি ক্যডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা রিভিউ আবেদন করেন। বর্তমানে মামলাটি সেই পর্যায়েই আছে।
অপরদিকে নন ক্যাডারে বা ডিপ্লোমাধারী পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি অংশ আদালতে আলাদা রিট আবেদন করেন, যেখানে ক্যাডার সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে ‘অবৈধ’ দাবি করা হয়।
সরকার ওই রিটের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আবেদন করে এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের করা রিটের ওপর আদালত স্থগিতাদেশ দেয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন সহকারী প্রকৌশলী বলেন, “নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি যেখানে জ্যেষ্ঠতা, বিভাগীয় পরীক্ষা, প্রযোজ্য বিধি এবং অন্যান্য যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখানে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একই ক্যাডারের উচ্চতর পদে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে জ্যেষ্ঠতা ও ক্যাডার কাঠামো নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অপরদিকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া এক কর্মকর্তা বলেন, “৫৬ বছর ধরে যে নিয়ম অনুযায়ী এ পদে পদোন্নতি হচ্ছে, এখন হঠাৎ করে সেটা কেন পরিবর্তন হবে? আমরা দীর্ঘ দিনের সেই প্রক্রিয়া থেকে বের হব না।”