স্টাফ রিপোর্টার:
বর্ষার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের সার্বিক নদীভাঙন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জেলার নদীভাঙন কবলিত পাঁচ উপজেলা কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর এবং চৌহালীতে গত তিন সপ্তাহে যমুনা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক বসতবাড়ি। ফলে ঘরবাড়ি ও আবাদী জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শত শত পরিবার। যমুনার তীব্র গ্রাসে ভিটামাটি হারিয়ে বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
শাহজাদপুরে তাণ্ডব ও জনজীবনের বিপর্যয়
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নে যমুনার তাণ্ডব সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে কেবল গত তিন সপ্তাহেই দুই শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। গত তিন মাসের ধারাবাহিক ভাঙনে এসব এলাকার শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসী, বারপাখিয়া, মোহনপুর ও হাতকোড়া গ্রামের শত শত বিঘা ধান, পাট, সরিষা, বাদাম ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলী জমি যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।
নদীপাড়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ধীতপুর-কুরসী গরুর হাট বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষি, অর্থনীতি ও পশু বেচা-কেনায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অন্ধকারে শিক্ষার্থীরা যেমন পড়াশোনা করতে পারছে না, তেমনি গরু চুরির আশঙ্কায় খোলা আকাশের নিচে রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে কৃষকদের।
ভিটামাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে ক্ষতিগ্রস্তরা
ভাঙনকবলিত এলাকার অধিকাংশ মানুষেরই মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু আর অবশিষ্ট নেই। ধীতপুর গ্রামের আন্না খাতুন (রুমা) জানান, বসতঘর সরানোর পর একপাশে বেড়াহীন জরাজীর্ণ ঘরে শেয়াল ও কুকুরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাছ ধরার ঝাঁকিজাল ঘিরে শিশুকন্যা ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে বসবাস করছেন। অনেক পরিবার অন্য গ্রামে বছরে মোটা অঙ্কের টাকায় জমি ভাড়া নিয়ে কিংবা ভিটায় পলিথিন টাঙিয়ে রোদ- বৃষ্টিতে ভিজে দিনরাত পার করছেন। সরকারি সামান্য ত্রাণ পেলেও পুনর্বাসনের অভাবে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
প্রশাসনের বক্তব্য ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যাখ্যা
শাহজাদপুরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা সারমিন জানিয়েছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তবে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাঊবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, ভাঙনকবলিত চরাঞ্চল এলাকাগুলোতে পাউবোর স্থায়ী কোনো প্রকল্প না থাকায় তাৎক্ষণিক কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। নতুন প্রকল্প পাস হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থায়ী ভাঙনরোধের দাবি
পাউবোর এই ব্যাখ্যার বিপরীতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ধীতপুর ও কুরসি বাজার এলাকায় সম্প্রতি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। জিন্নাহ মন্ডল, আব্দুল মালেক, আব্দুস সামাদসহ স্থানীয় বক্তারা অভিযোগ করেন, পাউবোর অবহেলার কারণেই গ্রামগুলো নদীতে বিলীন হচ্ছে। নদীর ১০-১২টি স্থানে জরুরি ভিত্তিতে বাঁশের ছটকা তৈরি করে বালুভর্তি জিওটিউব ও জিওব্যাগ ডাম্পিং করা হলে এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ঠেকানো সম্ভব হতো। শাহজাদপুরসহ পাঁচ উপজেলার লাখো মানুষের ভিটেমাটি রক্ষায় দ্রুত জিওটিউব ডাম্পিং ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন নদীপাড়ের দুর্গত বাসিন্দারা।