বিশেষ প্রতিবেদক:
যমুনার তীরের ছোট শহর সিরাজগঞ্জ এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও ‘টেসলা’র দখলে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারি, সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় শহরের সড়কে অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এর ফলে প্রতিদিন তীব্র যানজট, দুর্ঘটনা ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
মাত্র ২৮ দশমিক ৪৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯১৩টি ব্যাটারিচালিত রিকশার। অথচ স্থানীয়দের দেওয়া অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, শহরের সড়কে বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থাৎ, অনুমোদিত সংখ্যার তুলনায় শহরের সড়কে কয়েক গুণ বেশি ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইক এবং স্থানীয়ভাবে ‘টেসলা’ নামে পরিচিত যানবাহনের কোনো লাইসেন্সই দেয় না পৌরসভা।
শহরের বাজার স্টেশন গোলচত্বর, রেলগেট, বড় বাজার, মুজিব সড়ক ও চৌরাস্তা এলাকায় এসব যানবাহনের চাপ সবচেয়ে বেশি। ব্যস্ত সড়কগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করায় যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
লাইসেন্সের বাইরে হাজারো যান
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মারুফ আহমেদ বলেন, “সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে অধিকাংশ রিকশামালিক লাইসেন্স নিতে আগ্রহী নন। তারা সমিতির নেতাদের অবৈধ মাসিক চাঁদা দিয়ে রাস্তায় রিকশা চালাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।”
তিনি জানান, বর্তমানে পৌরসভায় ৩ হাজার ৯১৩টি ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স রয়েছে। বাকিগুলো অবৈধভাবে চলাচল করছে।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ‘টেসলা’ সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব যানবাহনের লাইসেন্স পৌরসভা দেয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে এসব যানবাহনকেও আইনগত কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
মারুফ আহমেদ আরও বলেন, “সিরাজগঞ্জ শহরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার রিকশা চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে বিভিন্ন ধরনের ১০ হাজারের বেশি রিকশা এবং অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে। ফলে প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।”
মাসিক চাঁদার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদনহীন রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। কয়েকজন রিকশাচালকও অভিযোগ করেছেন, সমিতির নেতারা তাদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করেন। সেই অর্থের একটি অংশ পৌর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয় বলেও তাদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। পৌর পুলিশের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিদ্যুৎ খরচের হিসাবও নেই
শুধু যানজট নয়, বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকের ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জ দিতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বা ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একটি অটোরিকশায় সাধারণত ১২ ভোল্টের চার থেকে ছয়টি ব্যাটারি থাকে। পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে প্রায় ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা।
শহর ও আশপাশে বিভিন্ন বৈধ ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সিরাজগঞ্জে এসব যানবাহন প্রতিদিন মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার কোনো হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে।
সিরাজগঞ্জে নেসকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অসিত পোদ্দার বলেন, “ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোতে কত বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তার কোনো হিসাব আমাদের কাছে নেই। তবে এসব যানবাহন বিদ্যুতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।”
অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযান পরিচালনার কোনো রেকর্ডও তাদের কাছে নেই।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে
শহরের বিভিন্ন সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের চালকদের একটি অংশের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চালক মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলাচল করেন এবং অনেক সময় অন্য যানবাহনকে সাইড না দেওয়ায় যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এতে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ব্যস্ত মোড় ও সড়কের সংকীর্ণ অংশগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
পৌরসভার কাছেও নেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি পৌরসভার অনুমোদিত মুখপাত্র। পৌরসভায় কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা, টেসলা বা ইজিবাইক রয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই।”
তিনি জানান, প্রতি বছর ৫ হাজার রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিগগিরই সব অননুমোদিত যানবাহনকে নিয়মের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে অবৈধ যানবাহন চলাচল করলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
স্থানীয়দের মতে, সভা-সেমিনারে আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। অবৈধ যানবাহনের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি, লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চার্জিং পয়েন্টের বৈধতা যাচাই এবং শহরের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তাদের দাবি, পৌরসভা, ট্রাফিক পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত শহরের যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। একই সঙ্গে বৈধ-অবৈধ যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।