হোসনেয়ারা পারভীন খুকু, খুলনা
শতবর্ষ ধরে সুন্দরবনের নোনাজলে ঘুরে বেড়ানো ঐতিহ্যবাহী দুই জলযান ‘এমএল বনরানী’ ও ‘এমএল বনকন্যা’ অবহেলার কবলে পড়ে অবশেষে কালের গর্ভে হারিয়ে গেল। সঠিক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়া ঐতিহাসিক এই লঞ্চ দুটিকে সম্প্রতি টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়েছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯০২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে কোলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ‘এমএল বনকন্যা’। এর ছয় বছর পর, ১৯০৮ সালে ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় সে সময়ের সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ ‘হেরিয়ার’। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে ‘হেরিয়ার’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘এমএল বনরানী’।
২০০১ সালে বৃহত্তর সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম দুটি বিভাগে বিভক্ত হলে ‘এমএল বনরানী’ পশ্চিম এবং ‘এমএল বনকন্যা’ পূর্ব বন বিভাগের অধীনে চলে যায়।
বার্মিজ সেগুনকাঠের রাজকীয় কারুকার্যে গড়া ‘বনরানী’ লঞ্চটি বহু ভিভিআইপি স্মৃতির সাক্ষী। এতে ভ্রমণ করেছেন আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটেনের প্রিন্স এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ বহু গুণীজন। ৩৫৪ অশ্বশক্তির স্টিম ইঞ্জিন নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাহাজটিতে ১৯৬২ সালে দুটি ডয়েটস ডিজেল ইঞ্জিন এবং ২০০৪ সালে ২০০ অশ্বশক্তির দুটি দাইও ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়।
লঞ্চটির সর্বশেষ চালক জাফর মাস্টার ও অবসরপ্রাপ্ত লস্কর মো. হারুন মোল্লা জানান, দীর্ঘ সেবা শেষে ২০১৬ সালে শেষবারের মতো চালু করা হয়েছিল বনরানীকে। এরপর থেকে চরম অবহেলায় খুলনার চানমারী ও ফরেস্ট ঘাট এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল মূল্যবান এই দুটি জলযান।
সুন্দরবন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, দুটি লঞ্চকে সচল করতে খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে ব্যয় প্রাক্কলন চাওয়া হয়েছিল। প্রতিটি লঞ্চ সংস্কারে সাড়ে তিন কোটি করে মোট সাত কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দিয়ে ২০১৮ সালে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও কোনো সমাধান মেলেনি।
অবশেষে নিলামের পথ বেছে নেয় বন বিভাগ। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, জরাজীর্ণ ‘এমএল বনরানী’ গত ৩০ মার্চ টেন্ডারের মাধ্যমে ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। অন্যদিকে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও মোঃ রেজাউল করীম চৌধুরী জানান, গত ১১ মে ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে ১২৪ বছর বয়সী ‘এমএল বনকন্যা’।
রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, “১০০ বছরের পুরনো যেকোনো স্থাপনারই প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য রয়েছে। মূল জাহাজের আদলে দুটি রেপ্লিকা তৈরি করা গেলে নতুন প্রজন্ম সুন্দরবনের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারত।”
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ জানান, লঞ্চ দুটির ঐতিহাসিক স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রেপ্লিকা তৈরির একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু হবে।
তবে লঞ্চ দুটি বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মোঃ বাবুল হাওলাদার বলেন, “লঞ্চ দুটি বিক্রি না করে ঐতিহ্য হিসেবে একটিকে করমজল এবং অপরটিকে কটকা পর্যটনকেন্দ্রে সংরক্ষণ করা যেত। এতে পর্যটকরা টিকিট কেটে পরিদর্শনের সুযোগ পেতেন, সরকারের রাজস্ব বাড়ত এবং নতুন প্রজন্মও সুন্দরবনের শতবর্ষী ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারত।”