গোলাম মোস্তফা জীবন॥
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অন্যান্য তৎপরতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও গোয়েন্দা নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পুলিশের অভ্যন্তরে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের নীরব সমর্থক বা ‘ইনসাইডার থ্রেট’-এর সম্ভাবনা।
বিশেষ করে রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকা গুলশানে বড় একটি ঝটিকা মিছিল সংঘটিত হওয়া এবং ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির নামে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে ঘিরে পুলিশের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুলশানের ঘটনায় থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানকে একটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওটি রাকিবুল হাসানেরই কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এই দুই ঘটনায় পুলিশের মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা কার্যক্রম, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে তথ্য সরবরাহ এবং দায়িত্ব পালনে সম্ভাব্য গাফিলতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অডিও নিয়ে তদন্ত
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমালোচনা করতে শোনা যায়। অডিওতে বলা হয়, ‘রাস্তায় থাকা পুলিশ খুবই দুর্বল’ এবং শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে পুলিশ কিছু করতে পারবে না।
অডিওটি ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের নামে প্রচারিত হলেও এটি তার কণ্ঠ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। ডিএমপি কমিশনারের আদেশে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে সরিয়ে সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি পুলিশের অভ্যন্তরে সাবেক সরকারের সমর্থকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নকে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাঠপর্যায়ে আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গুলশানের মিছিলেও প্রশ্ন
রাজধানীর গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায়ও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকশ মানুষকে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি তাজা ককটেলসহ দুজনকে আটক করা হয়।
ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৮০ থেকে ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এতসংখ্যক মানুষের জমায়েতের আগাম তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ছিল কি না—ঘটনার পর এ প্রশ্ন ওঠে। পাঁচ দিন পর গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
ফলে পুলিশের অভ্যন্তরে এখন দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং তথ্য পাওয়া গেলে তা যথাসময়ে মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো হয়েছিল কি না।
‘তথ্য ছিল, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?’
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, গুলশানের ঘটনার পর গোয়েন্দা কার্যক্রমের পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা কোনো তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন কি না, করে থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল কি না এবং জানানো হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
এ নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাহিনীর ভেতরে সম্ভাব্য ‘ইনসাইডার থ্রেট’ শনাক্ত করতেও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।
পুলিশের ডিসি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, গত ১৫ বছরের বেশি সময়ে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল। তার দাবি, এসব কারণে মাঠপর্যায়ের কিছু সদস্যের মধ্যে আগের রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব থেকে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল হলেও ইন্সপেক্টর, এসআই ও কনস্টেবল পর্যায়ের বড় একটি অংশ মাঠে বহাল রয়েছে। ফলে বাহিনীর অভ্যন্তরে কারও রাজনৈতিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে প্রভাব ফেলছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
‘ধীরে চলো’ নীতি?
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা কিছু পুলিশ সদস্যের মধ্যে কাজ করতে পারে। এ কারণে নিষিদ্ধ সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ কেউ সতর্কতা অবলম্বন করছেন—এমন ধারণা রয়েছে।
তবে এ ধরনের মনোভাবের কোনো পরিসংখ্যানগত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভেতরে এমন প্রবণতা থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলছে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো পুলিশ সদস্য তথ্য পাচার করছেন কি না কিংবা সাবেক দলের নেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদায়নে পরিবর্তন আনার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলসহ সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আবাসিক হোটেলে বোর্ডারদের তথ্য সংগ্রহ এবং ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমের কার্যক্রম তদারকির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ সম্প্রতি অপরাধ পর্যালোচনা সভায় রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, ব্লক চেক, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ডিবি, সিটিটিসি ও থানা পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কোনো ঝটিকা মিছিল বা তৎপরতা হলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও ডিসিদের জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশনার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
রাজধানীতে ২০০-এর বেশি চেকপোস্ট
সাম্প্রতিক নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর রাজধানীতে পুলিশের চেকপোস্টও বাড়ানো হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর ডিএমপি রাজধানীতে ২০০টির বেশি চেকপোস্ট বসানোর কথা জানিয়েছে। একই সময়ে নগরজুড়ে অভিযানে ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৪৭টি মামলা করার তথ্যও দিয়েছে পুলিশ।
এর আগে ডিএমপি কমিশনার রাজধানীর প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার এবং অপরাধীদের ঢাকায় প্রবেশ ঠেকাতে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
সাইবার নজরদারিও জোরদার
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)—সাবেক র্যাব—এর পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তারা দুই স্তরে কাজ করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যেসব ঘটনায় মোটরসাইকেল ব্যবহার হয়েছে, সেসব মোটরসাইকেলের নম্বর সংগ্রহ করে মালিকদের শনাক্তের কাজও চলছে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে সাদা পোশাকে সদস্যরা কাজ করছেন। পাশাপাশি এসআরবির সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করছে। সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডের ধরন দেখে তারা মনে করছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এসব তৎপরতার সমন্বয় করা হতে পারে। তাই সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
মূল প্রশ্ন এখন গোয়েন্দা সমন্বয়ে
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে একদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য তৎপরতা এবং অন্যদিকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সম্ভাব্য আনুগত্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো পুলিশ সদস্যের রাজনৈতিক আনুগত্য বা তথ্য পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় প্রশ্ন হলো—আগাম তথ্য কতটা কার্যকরভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সেই তথ্য কতটা দ্রুত বিনিময় হচ্ছে এবং পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর পুলিশের তৎপরতা ও চেকপোস্ট বাড়লেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্যের মান, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির ওপর।