তরুণ কান্তি, ঠাকুরগাঁও থেকে॥
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিমা কারিগররা। তবে কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে প্রতিমার আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পীরা।
জেলা সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের ফারাবাড়ি গ্রামসহ বিভিন্ন প্রতিমাপাড়া সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় দিন-রাত এক করে প্রতিমা তৈরির কাজ চালাচ্ছেন কারিগররা। নির্ঘুম রাতে তাদের পাশাপাশি নারী ও শিশুসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও প্রতিমার গায়ে তুলির শেষ আঁচড় ও সাজসজ্জার কাজে হাত বাড়াচ্ছেন। তবে নির্ধারিত সময়সীমা এবং উপকরণের অস্বাভাবিক দামের কারণে নতুন করে আর কোনো প্রতিমার অর্ডার নিতে সাহস পাচ্ছেন না কারিগররা।
স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশ, খড়, মাটি, কাঠ, দড়ি, পেরেক, রং ও সাজসজ্জার প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি প্রতিমার বিক্রয়মূল্য। কাঁচামালের বাড়তি দর সামাল দিতে গিয়ে এবার অনেকেই প্রতিমা তৈরির সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছেন।
রাজাগাঁও ইউনিয়নের চাপাতি গ্রামের একাধিক কারিগর জানান, গত বছর তারা দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য দেব-দেবীর ১৬টি প্রতিমা তৈরি করলেও এবার বাধ্য হয়ে মাত্র ১০টি প্রতিমার কাজ করছেন। একই চিত্র সালান্দার ইউনিয়নের দেওগাঁও গ্রামের প্রতিমা কারিগর শুভ রায়ের ঝুলিতেও। তিনি জানান, গত বছর ১১ লাখ টাকায় ২২টি প্রতিমা গড়ার কাজ করেছিলেন। অথচ চলতি মৌসুমে মাত্র ৮ লাখ টাকায় ১৬টি প্রতিমার কাজ পেয়েছেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শুভ রায় বলেন, “গত বছর যে বড় বাঁশ ৩৫০ টাকায় কিনেছি, এবার তার দাম দ্বিগুণ। শুধু বাঁশই নয়, খড় থেকে শুরু করে রং—সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া। গত বছর প্রতি সেট প্রতিমা বিক্রি করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা নিট লাভ থাকত। এবার উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, লাভ তো দূরের কথা, মূল পুঁজি তোলা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে।”
একই সুর ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের কারিগর বিন্দু রায়ের কণ্ঠেও। আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় এবার তিনি আগাম সতর্ক থেকে কম অর্ডার নিয়েছেন। গত বছর ১২ সেটে ৮ লাখ টাকার কাজ করলেও এবার ৬ সেটে মাত্র ৪ লাখ টাকার অর্ডার হাতে নিয়েছেন তিনি। বিন্দু রায় জানান, “উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়েছে যে, গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত মূলধন বিনিয়োগ করেও মুনাফার মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পৈতৃক এই পেশা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
উল্লেখ্য, আগামী ১৬ অক্টোবর ‘মহাষষ্ঠী’ পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের এই সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। উৎসবের শেষ দিন ২১ অক্টোবর ‘বিজয়াদশমী’তে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে পাঁচ দিনব্যাপী এই শারদীয় দুর্গোৎসবের।