স্টাফ রিপোর্টার:
একটি দীর্ঘ সময়। প্রায় সাড়ে ১৭ বছর। জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যখন একজন মানুষ পরিবারের সঙ্গে থাকার, স্বাভাবিক জীবনযাপনের কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের জীবনেও সেই দীর্ঘ সময় কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর।
২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন তিনি। একের পর এক মামলা, আইনি লড়াই এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে কেটে যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। অবশেষে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিভিন্ন মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি।
কারাগারের দীর্ঘ সেই অধ্যায় পেরিয়ে মুক্ত জীবনে ফেরার পর তার বয়স, পারিবারিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, বদলায়নি তার রাজনৈতিক অবস্থান।
কারাগারের ভেতরেই কেটে গেল জীবনের বড় সময়
মামুনের বিরুদ্ধে মোট ২২টি মামলা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। এসব মামলার মধ্যে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও অস্ত্র আইনের মামলাও ছিল।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে এসব মামলার কয়েকটিতে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা উচ্চ আদালতে বাতিল বা পরিবর্তিত হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি দুর্নীতি মামলায় হাইকোর্ট তার তিন বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে তাকে খালাস দেন। একই বছরের ডিসেম্বরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ওই মামলায় তার স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিনের সাজাও বাতিল হয়।
অর্থপাচার মামলায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট সাত বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে মামুনকে খালাস দেন। পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগও মামুন ও তারেক রহমানকে ওই মামলায় খালাস দেন।
এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অস্ত্র মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে তাকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
তার আইনজীবীদের ভাষ্য, এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। তবে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন আদালতের রায় মামুনের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
মায়ের মৃত্যু: কারাগার থেকে শেষ বিদায়ে
দীর্ঘ কারাবাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে মায়ের মৃত্যু।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান মামুনের মা মোসাম্মৎ হালিমা খাতুন। কারাগার থেকে প্যারোলে কয়েক ঘণ্টার জন্য মুক্ত হয়ে মায়ের জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তবে কারাগারে ফিরে যেতে হয় তাকে। ব্যক্তিগত শোকের সেই মুহূর্তও শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘ বন্দিজীবনের অংশ হয়ে থাকে।
তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক
২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর থেকেই তারেক রহমানের সঙ্গে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নানা বক্তব্য ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে।
মামুনের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানকে চাপে রাখা এবং তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ঘটনায় মামুনের নাম সামনে আনা হয়েছিল। তবে এটি তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান ভিন্ন।
দীর্ঘ কারাবাসের পরও তারেক রহমানের সঙ্গে মামুনের সম্পর্ক এবং বিএনপির প্রতি তার আস্থায় পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।
‘দুঃসময়ে সম্পর্কের পরীক্ষা’
রাজনীতিতে ক্ষমতার সময়ের সম্পর্ক যেমন আলোচিত হয়, তেমনি দুঃসময়ে সেই সম্পর্ক কতটা টিকে থাকে—সেটিও রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
মামুনের ঘনিষ্ঠজনরা মনে করেন, তার দীর্ঘ কারাবাসের সময়টিই ছিল সেই সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তাদের ভাষায়, মামলা, কারাবাস, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষতি—কোনোটিই বিএনপির প্রতি তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি।
এ কারণেই বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের কাছে তিনি দীর্ঘদিনের ‘বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত’ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত—এমন দাবি করেন তার ঘনিষ্ঠরা।
মুক্তির পর নতুন অধ্যায়
২০২৪ সালের আগস্টে কারামুক্তির পর মামুনের জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। দীর্ঘ সময় পর পরিবারের কাছে ফেরার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও তার উপস্থিতি নতুন করে দৃশ্যমান হয়।
কারাগারের দীর্ঘ বছরগুলো তার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। হারিয়েছেন স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনযাপনের সুযোগ, মায়ের শেষ সময়ের বড় একটি অংশ এবং জীবনের মূল্যবান বহু বছর।
তবে তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে মামুনের গল্প কেবল একজন দীর্ঘদিনের কারাবন্দির গল্প নয়। এটি তাদের কাছে রাজনৈতিক বিশ্বাস, সম্পর্ক ও দুঃসময়ে অবস্থান ধরে রাখার গল্পও।
সাড়ে ১৭ বছর পর কারাগারের দরজা পেরিয়ে যখন তিনি মুক্ত জীবনে ফিরলেন, তখন চারপাশের অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা, বদলেছে সময়ের হিসাব। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, একটি জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসেনি—বিএনপির প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্যে।
আদালতের রায়গুলো তার জীবনের আইনি অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করবে। আর দীর্ঘ কারাবাস, মায়ের মৃত্যু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং মুক্তির পর নতুন করে রাজনৈতিক জীবনে ফেরার গল্প হয়ে থাকবে তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়।