স্টাফ রিপোর্টার॥
সরকারি গাড়ি নিয়ে একাধিক যানবাহনে ধাক্কা, সঙ্গে মদের বোতল, মদ্যপ অবস্থায় থাকার অভিযোগ এবং পরে আদালতে হাজিরা—একের পর এক ঘটনায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলী দেবাশীষ কুমার মণ্ডলকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনার ওই ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই থাকা নানা অনিয়ম, সরকারি সম্পদ ব্যবহারে অসঙ্গতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে কথিত যোগসাজশের অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সরকারি প্রকৌশলীর এমন কর্মকাণ্ড শুধু অধিদপ্তরের ভাবমূর্তিই নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
দেবাশীষ কুমার মণ্ডল (আইডি নম্বর-৭০০২০৩) সম্প্রতি মাগুরা সওজের ফার্স্ট লাইন ওয়ার্কশপ উপবিভাগের সহকারী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি পেয়ে যশোর মেকানিক্যাল উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) হিসেবে পদায়ন হন। কিন্তু পদোন্নতির পরপরই খুলনায় সরকারি গাড়িতে তার চলাচল ও ২৭ সেপ্টেম্বর রাতের ঘটনার পর তার দায়িত্ব পালন এবং পদায়ন নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে খুলনা নগরীর সাতরাস্তা ও ময়লাপোতা এলাকায় সওজের সরকারি গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-গ-১৪-৭৩০০) একটি স্কুটার ও অটোরিকশাসহ কয়েকটি যানবাহনে ধাক্কা দেয়। গাড়িটিতে দেবাশীষ, অফিস সহকারী মামুন এবং এক নারী ছিলেন বলে জানা গেছে। এতে অটোরিকশার দুই যাত্রী গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা গাড়িটি আটকে চালক ও দেবাশীষকে মারধর করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন জানান, পুলিশ গাড়ি থেকে আধা বোতল দেশি মদ উদ্ধার করে।
ওসি বলেন, দেবাশীষসহ দুজনকে থানায় নেওয়া হলেও সঙ্গে থাকা নারী পুলিশ পৌঁছানোর আগেই চলে যান। অফিস সহকারী মামুনের মদ্যপানের বৈধ লাইসেন্স থাকায় তাকে থানা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। দেবাশীষকে পরদিন আদালতে পাঠানো হলে পরে জরিমানা ও মুচলেকায় তিনি মুক্তি পান।
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর সওজের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দেবাশীষ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিদপ্তরের কিছু কর্মচারীকে ব্যবহার করতেন। সরকারি যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া ও বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
খুলনা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “দেবাশীষ সহকারী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর যশোর মেকানিক্যাল উপবিভাগে পদায়ন হয়েছেন। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় দায়িত্ব পালন করছেন, তা আমার জানা নেই।”
এদিকে দেবাশীষের খুলনায় অবস্থান ও দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সওজের একাধিক সূত্রের দাবি, খুলনায় পর্যাপ্ত কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য তাকে সেখানে রাখা হয়েছিল। খুলনা সওজের মেকানিক্যাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গুঞ্জন বড়ুয়ার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
সূত্রগুলোর অভিযোগ, গুঞ্জন বড়ুয়ার হয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে কমিশন-সংক্রান্ত লেনদেনেও দেবাশীষ ভূমিকা রাখতেন। এমনকি মাগুরা থেকে তাকে খুলনায় বদলির পেছনেও প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সওজের অভ্যন্তরীণ সূত্রের আরও দাবি, খুলনার এক প্রভাবশালী ঠিকাদার প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে গুঞ্জন বড়ুয়াকে বগুড়া থেকে খুলনায় বদলি করিয়েছেন। পরে ওই ঠিকাদার, দেবাশীষ ও গুঞ্জন বড়ুয়া মিলে সওজের মেকানিক্যাল বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রস্তুত, কাজ বণ্টন ও কমিশন ভাগাভাগি নিয়ন্ত্রণ করতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে ২০ লাখ টাকা লেনদেন কিংবা কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।
সওজের খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম খান বলেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন; তবে বিস্তারিত জানেন না।
এদিকে মাগুরা সওজের ফার্স্ট ক্লাস ওয়ার্কশপ উপবিভাগে দায়িত্ব পালনকালে দেবাশীষের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন সূত্রের দাবি, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকতেন না এবং কখনো কখনো মাসে মাত্র একদিন অফিসে এসেও বেতন-ভাতা তুলতেন। এসব অভিযোগের মধ্যেই তিনি পদোন্নতি পান বলে দাবি সূত্রগুলোর।
দেবাশীষ কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—একজন সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ থাকার পরও তার দায়িত্ব পালন, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভাগীয় তদারকি কতটা কার্যকর ছিল। একই সঙ্গে সরকারি যানবাহন ও সম্পদের ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের আচরণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।