বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন

কৃত্রিম সংকট ও নীতিমালার মারপ্যাঁচ: সার না পেয়ে দিশেহারা কৃষক, হুমকিতে আমন উৎপাদন

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ২.০৭ পিএম

ডেইলী স্কাই রিপোর্ট॥



মাঠে মাঠে এখন আমন ও বীজতলার পরিচর্যার ভরা মৌসুম। ঠিক এ সময়েই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র সার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় পর্যায়ে পর্যালোচনার ভিত্তিতে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করা হলেও মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মেহেরপুর, বগুড়া, যশোর ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলায় চাহিদামতো সার না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলাবাজার থেকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও কোথাও ক্ষোভের আগুনে গুদাম ভাঙচুর ও সার লুটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি মজুত আর মাঠের হাহাকারের এই বিরাট বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—সংকটটি কি সরবরাহ ঘাটতির, নাকি নতুন নীতিমালার ভীতি আর কারসাজির ফসল?

মাঠের বাস্তবতা ও কৃষকের ভোগান্তি

ইউরিয়ার পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও রোপা আমন ও বীজতলার উর্বরতা বৃদ্ধিতে কৃষকদের মধ্যে নন-ইউরিয়া সারের (টিএসপি ও ডিএপি) অতিরিক্ত চাহিদা দেখা দিয়েছে। কুড়িগ্রামের আদিতমারী ও মেহেরপুরের ভাটপাড়া এলাকার কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলাররা ‘সার নেই’ বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তবে সরকারি নির্ধারিত বস্তাপ্রতি ১,৩৫০ টাকার টিএসপি বা ১,০৫০ টাকার ডিএপি সারের স্থানে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা অতিরিক্ত দিলেই তা পার্শ্ববর্তী খুচরা দোকানগুলোতে অনায়াসে পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষিবিদরা অবশ্য সারের অপ্রয়োজনীয় ও ভুল ব্যবহারকেও এই সংকটের পেছনে একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন জানান, কৃষকদের একাংশ বৈজ্ঞানিক সুপারিশের বাইরে গিয়ে চরাঞ্চল বা অন্যান্য এলাকায় ইউরিয়ার পরিবর্তে ডিএপি টপ ড্রেস বা উপরি প্রয়োগ করছেন। ফলে একদিকে সারের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে আগাম কেনার প্রবণতা ও একশ্রেণির মানুষের মাধ্যমে দ্রুত হাতবদলে কৃত্রিম সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

নীতিমালা আতঙ্ক ও ডিলার সিন্ডিকেটের কারসাজি

চলতি ২০২৫ সালের সমন্বিত সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালায় সাব-ডিলার ও প্রায় ৪৫ হাজার খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। ৯ আগস্ট এই সংশোধিত নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে প্রায় ১০ হাজার ৮০০ নিবন্ধিত পুরোনো ডিলার ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, অসাধু ডিলাররা নিজেদের লাইসেন্স বা বরাদ্দ হারানোর ভয়ে অথবা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সার উত্তোলন না করে কিংবা আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। পঞ্চগড় বাদে উত্তরাঞ্চলের ১৫টি জেলার বহু ডিলার চাহিদাপত্র (ডিও) দেওয়া সত্ত্বেও সার উত্তোলন না করায় জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে মেহেরপুর, রাজশাহী ও জয়পুরহাটের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তবে বিএফএ (বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন)-এর নেতারা কাঠামোগত ভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে চাষাবাদ বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় আঞ্চলিক বরাদ্দ বাড়েনি। তদুপরি, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকটের কারণে ৬টি সার কারখানার মধ্যে ৩টি বন্ধ থাকায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

মজুত পরিস্থিতি ও সরকারি তৎপরতা

সরকারি হিসেব বলছে, জাতীয় পর্যায়ে সারের বড় কোনো ঘাটতি নেই। কৃষি সচিব সেলিম খান জানান, গত ৫ বছরের মধ্যে এবার সারের সর্বোচ্চ প্রারম্ভিক মজুত রয়েছে। ১৯ আগস্টের হিসেব অনুযায়ী, ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১৭.৬৭ লাখ টন সার মজুত আছে, যা গত বছরের তুলনায় ১.৬৯ লাখ টন বেশি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে:

তদারকি জোরদার: দুই যুগ্ম সচিব ও তিন উপসচিবের সমন্বয়ে ৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অগ্রিম বরাদ্দ: সেপ্টেম্বর মাসের সারের বরাদ্দ ২৫ আগস্ট থেকেই উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বিএফএর কঠোর বার্তা: নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি, নিয়মিত বিক্রয় রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং উপজেলা কৃষি অফিসকে অবগতির জন্য ডিলারদের কড়া নির্দেশ দিয়েছে বিএফএ।

উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা ও বিশেষজ্ঞ মতামত

মাঠের সংকট না কাটলে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষক রাস্তায় কেন নামবেন বা গুদাম ভাঙচুর করবেন? এটি সরাসরি প্রশাসনিক ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিপর্যয়। ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের উপযুক্ত সরবরাহ না থাকলে রোপা আমনের ফলন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। বোরো ও আউশের ক্ষতির পর আমন উৎপাদনে ঘাটতি হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

জাতীয় পর্যায়ে গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কাগজ-কলমের হিসাব কৃষকের কোনো কাজে আসছে না, যদি না নির্দিষ্ট দামে সময়মতো সার তারা হাতে পান। ডিলারদের কারসাজি রোধ, রাজনৈতিক অসৎ প্রভাব দূর করা এবং নতুন নীতিমালাজনিত জটিলতা নিরসন করে দ্রুত মাঠে সার পৌঁছানো না গেলে চলতি মৌসুমের কৃষি উৎপাদন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com