সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম

ব্যাপক ধরপাকড়েও কমছে না অপরাধ

  • আপডেট সময় সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬.১৯ পিএম

সহজে জামিন, পুনর্বাসনের অভাব ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষ প্রতিনিধি॥

হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুতাসহ ৪৫টি মামলার আসামি ডাকাত সর্দার তৈয়ব আলী। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযোগ। সম্প্রতি সাত সহযোগীসহ আবারও গ্রেফতার হয়েছেন তিনি।

একইভাবে, নরসিংদীর শিবপুরে ঘুমন্ত বাবাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বড় ছেলে শাকিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবারের এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাকিল প্রায় পাঁচ মাস আগে জামিনে কারাগার থেকে বের হন। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।

তৈয়ব আলী বা শাকিল চৌধুরীই শুধু নন, দেশে এমন বহু অপরাধীর বিরুদ্ধে বারবার গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে প্রতিদিন বিভিন্ন অপরাধে প্রায় অর্ধসহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করছে পুলিশ। সারা দেশে এ সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। কিন্তু বিপুল সংখ্যক গ্রেফতারের পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সহজে জামিন পাওয়ার বিষয়টিকে নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গ্রেফতার বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কারা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি অপরাধের কারণ বিশ্লেষণ, কারাগারে সংশোধনমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন, পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মসংস্থানের অভাব, কারাগারে পর্যাপ্ত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না থাকা, অপরাধের ধরন ও কারণ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সাধারণ অপরাধীও বারবার কারাভোগের পর একসময় পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হচ্ছে।

বারবার গ্রেফতার, আবারও অপরাধ

গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শুধু র‌্যাবের হাতেই প্রায় দেড় হাজার অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, গ্রেফতারদের মধ্যে মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য রয়েছে। একই অপরাধীকে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত গ্রেফতার করতে হয়েছে। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

আড়াই মাসে গ্রেফতার প্রায় দেড় লাখ

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অভিযানে ৩৯ হাজার ২৬৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলা ও অন্যান্য অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন আরও ১ লাখ ২ হাজার ৭২২ জন।

সব মিলিয়ে এ সময়ে বিশেষ অভিযান ও অন্যান্য মামলায় মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬১৩ জন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৭৬টি। একই সময়ে ডাকাতির ঘটনায় ৩১৭টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১ হাজার ৬৭টি এবং চুরির ঘটনায় ৫ হাজার ৬৩৬টি মামলা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মামলায় প্রতিফলিত সংখ্যার তুলনায় সংঘটিত অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

রাজধানীতে প্রতিদিন গ্রেফতার প্রায় অর্ধসহস্র

রাজধানীতেও পুলিশের নিয়মিত অভিযানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম চার দিনে ১ হাজার ৮৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় ৪৪২ জন, ২ সেপ্টেম্বর ৪৩৮ জন এবং ৩ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টায় ৫৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রতিদিন এত বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিদ্যমান পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি

অপরদিকে, অতিরিক্ত বন্দির চাপে দেশের কারাগারগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। সদ্য বিদায়ী কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন গত মাসে তার শেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি রয়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ হাজার বন্দি ধারণক্ষমতার বিপরীতে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৯৮ হাজার বন্দি অবস্থান করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারে অতিরিক্ত বন্দির চাপের কারণে সংশোধন, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে পুলিশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের একাংশ মনে করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে একাধিক ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এদিকে, বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘নাম্বিও’র ২০২৬ সালের ক্রাইম অ্যান্ড সেফটি ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অপরাধ সূচক সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে ভালো আছে এবং গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।

তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

তবে অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

‘শুধু গ্রেফতার করলেই অপরাধ কমবে না’

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রেফতারের সংখ্যা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নতি নির্ধারণ করা যায় না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গ্রেফতারের পরবর্তী প্রক্রিয়াগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, শুধু গ্রেফতার করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। গ্রেফতারের পরবর্তী কার্যক্রমগুলোও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কারাগার—এই তিনটি পক্ষেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্রেফতারের পর আসামিরা কারাগারে কাদের সংস্পর্শে আসছে, সেখানে কী ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে এবং অপরাধের ধরন ও কারণ কী—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।

তার মতে, এসব বিষয় উপেক্ষা করে শুধু গ্রেফতার বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বারবার একই অপরাধে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

মো. রেজাউল করিম বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অপরাধীরা সহজে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে কারাভোগের পর বারবার জামিনে মুক্তি পেয়ে একই ব্যক্তি একসময় পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হতে পারে।

তিনি মাদকাসক্ত ও সুবিধাবঞ্চিত অপরাধীদের পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

তার ভাষায়, শুধু গ্রেফতার করে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও কারা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের পাশাপাশি অপরাধীদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একই অপরাধীকে বারবার গ্রেফতার করার চক্র চলতেই থাকবে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসইভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন শুধু ধরপাকড় নয়; প্রয়োজন কার্যকর তদন্ত, দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার, অপরাধীর সংশোধন, পুনর্বাসন এবং সমাজে ফিরে আসার বাস্তব সুযোগ।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com