বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন

নারী মাদকাসক্ত বাড়ছে উদ্বেগজনকহারে

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭.২৩ পিএম
প্রতিকী ছবি, সংগ্রহীত।
  • ২৪ শতাংশের বয়স ৩৬ থেকে ৪৫ বছর
  • ৪৫ শতাংশ ইয়াবায় আসক্ত

বিশেষ প্রতিনিধি॥

প্রেম করে বিয়ে করে স্বামীর সাথে ভোলা থেকে রাজধানীতে চলে আসেন পারমিতা। সদ্য এইচএসসি পাশ পারমিতার বয়স তখন ১৮। তরুন দম্পতি বাসা ভাড়া নিয়ে শুরু করেন সংসার জীবন। স্বল্প বেতন চাকুরী করা স্বামী রাসেল(ছদ্দনাম) স্ত্রীকে ভর্তি করে দেন একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কয়েক মাস পর রাসেল রাতে বাসায় সিগারেটের গন্ধ পেতে শুরু করেন। এরও কয়েক মাস পর জানতে পারেন তার স্ত্রী ইয়াবায় আসক্ত। স্ত্রীও অকপটে স্বীকার করেন সেই কথা। জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছ থেকে তিনি সিগারেট ও ইয়াবা সেবন শিখেছেন। অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রীকে মাদক থেকে সরিয়ে রাখতে পারেননি রাসেল। শেষ পরিনতি হয় বিবাহ বিচ্ছেদ। রাসেল এখন উচ্চি শক্ষার্থে আছেন জাপানে। নতুন করে শুরু করেছেন সংসার। আর তার স্ত্রী পারমিতা কোথায় আছেন, সেই তথ্য জানাতে পারেননি রাসেল।
শুধু পারমিতাই নয়, আশঙ্কাভাবে বাড়ছে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা। রাজধানীতে বসবাসকারী নারীদের মধ্যে এই সংখ্যা উদ্বেগজনক। অনেকে গাঁজা, ইয়াবা এবং ইলেকট্রিক সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এছাড়া বিপথগামী তরুণীদের অনেকে বারে গিয়ে নিয়মিত মদ পান করছেন। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে শিক্ষার্থী থেকে বেকার যেমন আছেন তেমনি উচ্চ শিক্ষিত চাকুরীজীবী ও ব্যবসায়ীও আছেন।
দেশে নারী মাদকসেবীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আহছানিয়া মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সেখানে বর্তমানে ৩টি বেড থাকলেও ভর্তি আছেন ৩৩ জন নারী মাদকাক্ত, যাদেরও মধ্যে বেশীরভাগই মানসিকভাবেও অসুস্থ।
আহ্ছানিয়া মিশন থেকে গত ৬ মাসে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষনে দেখা যায়, নারী মাদকাসক্তদের মধ্যে ৭৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রায় ২৪ শতাংশের বয়স ৩৬ থেকে ৪৫ বছর। নারী মাদক সেবীদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ ইয়াবায় এবং ৪৩ শতাংশ গাঁজাতে আসক্ত। অ্যালকোহলে আসক্ত প্রায় ৭ শতাংশ। এখানে চিকিৎসাধীন ৭৭ শতাংশের বসবাস ঢাকাতেই।
নিয়মিত মাদক সেবন করেন এমন নারীদের মধ্যে যেমন আছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বেসরকারি চাকরিজীবী, তেমনই আছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, গৃহিণী, ব্যবসায়ী এবং বেকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় নীলার (৪১)। বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরে শুরু করেন মাদক গ্রহন। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর মাদকগ্রহনের মাত্রা তীব্র হয়। পরবর্তীতে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। তারই জের ধরে হয় বিবাহ বিচ্ছেদ। পরবর্তীতে আবারো বিয়ে করেন। জন্ম হয় তৃতীয় সন্তানের। কিন্তু তারপরও বের হয়ে আসতে পারেননি মাদক থেকে।
তিনি জানান, দীর্ঘূদিন মাদক গ্রহনের ফলে অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়তেন তিনি। হঠাৎ রাগান্বিত হয়ে কখনো কখনো আক্রমণাত্মক আচরন করতেন। অতিরিক্ত কথা বলতেন। ঘুমও হতো না ঠিতমতো। বাসায় জিনিষপত্র ভাঙচুর করতেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকতো। নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা প্রকাশ করতে শুরু করতেন। এসব আচরণ তার দাম্পত্য সম্পর্কে গুরুতর অবনতির কারন হয়ে দেখা দেয়, যা বিবাহ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়।
তবে পরবর্তীতে রাজধানীর একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটাই সুস্থ তিনি। কাজ করছেন একটি স্বানামধন্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে।

অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায় রুমার (৩৯)। তিন সন্তান নিয়ে তার ছিলো সুখের সংসার। বিয়ের পর স্বামীর মাধ্যমে তার সিগারেট ও গাঁজা সেবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে তিনি ইয়াবা গ্রহণ শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি বিশ্বাস করতেন, মাদক তার মানসিক চাপ কমাতে, একাকীত্ব ভুলতে এবং সামাজিকভাবে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবহার নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়। স্বামীর মানসিক অসুস্থতা, দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পরিবারের সদস্যদের দোষারোপ এবং আবেগগত একাকীত্ব তার মাদক গ্রহণকে আরও তীব্র করে তোলে।
ক্রমশ: তার আচরণ ও জীবনযাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব ও যত্ন কমে যায়, দাম্পত্য সম্পর্কে অবনতি ঘটে এবং পরকীয়াসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়েন। মাদক গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তিনি অধিকাংশ সময় মাদকসেবী বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি অস্বীকার করতেন এবং নিজের আচরণের জন্য পরিবারকে দায়ী করতেন। এর ফলে পারিবারিক সম্পর্ক আরও ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তিনিও রাজধানীর একটি সুপরিচিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন আছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিশেষ করে রাজধানীতে নারীদের মধ্যে অ্যালকোহলে আসক্তির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বারে নিয়মিত অ্যালকোহল সেবন করেন এমন একাধিকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন অনেক বারেই নারী অ্যালকোহল সেবনকারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্তিতি দেখা যায়। বিশেষ করে যেসব বারে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুন্দর, সেইসব বারগুলো নারীদের আনাগোনা বেশী বলে জানান তারা।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতর (ডিএনসি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী আবেদন করেছেন। এদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকশ পারমিট হস্তান্তরের অপেক্ষায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে।
নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও এবং উত্তরা এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও এবং রমনা এলাকা থেকেও নারীদের অনেকে মদ পানের পারমিটের আবেদন করেছেন। তবে এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মদের বারে পেশাদার ‘বার গার্ল’ হিসাবে কাজ করেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসি’র মুখপাত্র সহকারী পরিচালক মোঃআব্দুল হালিম রাজ বলেন, ‍‍”অ্যলকোহল সেবনের জণ্য সুনিদিষ্ট কিছু শর্ত পূরন সাপেক্ষে প্রাপ্ত বয়স্ক যে কেউ অ্যলকোহল পানের জন্য আবেদন(পারমিট) করতে পারেন। সেখানে নারী-পুরুষ কোন জেন্ডারিং করা হয় না।”
নারীদের মধ্যে অ্যালকোহল পানের পারমিটের আবেদনকারীর সংখ্যা পূর্বেও তুলনায় বেড়েছে কিংবা কমেছে কিনা তাৎক্ষনিকভাবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি তিনি।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com