মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ন

‘যেন অলৌকিক ঘটনা’: নেপালে সুড়ঙ্গ থেকে যেভাবে উদ্ধার হল ২ শ্রমিক

  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬.৩৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

সুড়ঙ্গটিতে আরও অনেকের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে।

উদ্ধারকারীদের আশা, অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হবে।



নিউজ ডেস্কঃ



নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যা ও ভূমিধসের নয়দিন পর ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ও উদ্ধার কার্যক্রমের এ সাফল্যকে ‘অলৌকিক’ আখ্যায়িত করছেন এর সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা।

কারণ পাহাড় ধসে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির সুরঙ্গটির মুখ এমনভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, একে অনেকটাই ‘জীবন্ত কবরের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকে। উদ্ধারকর্মীদের প্রাণান্ত চেষ্টার পর দুই শ্রমিককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, গভীর সুরঙ্গটির ভেতরের দিকে আরও অনেকে আটকে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ অনেকের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে। উদ্ধারকারীদের আশা, আরও অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হবে।

তবে এরইমধ্যে সুরঙ্গটি থেকে এক শ্রমিকের মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীদের ধারণা, বন্যার সময় সুড়ঙ্গ থেকে পালানোর চেষ্টাকালে পানিতে আটকা পড়ে ওই শ্রমিক মারা যান।

অভিযানে যুক্ত থাকা এক টানেল বা সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ বিবিসিকে বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে তারা ‘অলৌকিকভাবে’ জীবিতদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বিবিসিতে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত ইন্টারন্যাশনাল টানেলিং অ্যান্ড আন্ডারগ্রাউন্ড স্পেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর্নল্ড ডিক্স নামে এক বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। আর্নল্ড নেপালের জলবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে ‘ত্রিশূলী ৩এ’ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবরুদ্ধ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ভেতরে ঢোকার কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছেন।

নানা প্রতিকূলতার মুখেও শুক্রবার দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করার ঘটনাকে বর্ণনা করতে গিয়ে আর্নল্ড বলেন, “এটি যেন একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। আমি এমন কোনো উদ্ধার অভিযান জীবনে দেখিনি; যেখানে আগে পাহাড়ে দৃশ্যমান থাকা একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করতে হয়, যা এখন পুরোপুরি মাটির নিচে চলে গেছে। এর মধ্য দিয়েই আমরা পাহাড় ধসের ব্যাপকতা কল্পনা করতে পারি। এ ধস সুরঙ্গের প্রবেশপথটিকে পুরোপুরি মাটির নিচে কবর দিয়ে ফেলেছিল।”

আর্নল্ডের মতে উদ্ধার অভিযানের প্রথম চ্যালেঞ্জটিই ছিল, পাহাড় ধসের ফলে বদলে যাওয়া ভূমিরূপের মধ্য থেকে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান ও সুরঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করা। প্রকৌশল বিদ্যা, পুরনো মানচিত্র, দুর্যোগের পর পাওয়া উপগ্রহের ছবি, হেলিকপ্টার থেকে তোলা ভিডিও এবং পাহাড়ের ওপর খুঁজে পাওয়া বিদ্যুৎ খুঁটির মত চিহ্ন ব্যবহার করে আর্নল্ড ও তার দল সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত এবং খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করেন।

বহু খোঁড়াখুঁড়ির পর আর্নল্ড ও তার সুরঙ্গের মুখটি খুঁজে পান। তবে তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ছিল সুরঙ্গে আটকে থাকা জীবিত মানুষদের অবস্থান শনাক্ত করা।

আর্নল্ড বলেন, “আমরা জানতাম তারা সুরঙ্গে সামনের দিকে কোথাও আছে, কিন্তু ঠিক কোথায় আছে তা জানা ছিল না। তাই আমাদের সঠিক দিক মেপে খনন শুরু করতে হয়েছিল। এ সময় আমরা কোনো আওয়াজ বা কারও স্বর শোনা যায় কি না সেদিকে মনোযোগ দিয়েছিলাম।

“উদ্ধারকারীদের কাদা এবং গাড়ির চেয়েও বড় বড় পাথরে পুরোপুরি আটকে যাওয়া একটি সুড়ঙ্গে মাটি ভেদ করে এগোতে হয়েছিল। পথ পরিষ্কার করতে আমাদের বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়।”

আর্নল্ড বলছেন, তারা সাধারণত এসব কাজে বিস্ফোরক ব্যবহার করতে চান না। তারণ এতে আটকে থাকা মানুষ ও উদ্ধারকারীদেরও বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারপরও নিরুপায় হয়ে এ ক্ষেত্রে বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি সুড়ঙ্গের গঠন নষ্ট না করে নিখুঁতভাবে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরির জন্য নেপাল সেনাবাহিনীর কাজের উচ্ছসিত প্রশংসা করেন।

এর পরের কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বিস্ফোরণে পথ তৈরির পর তারা দেখতে পান সুড়ঙ্গটি এখনও পানিতে পরিপূর্ণ। পরে খননযন্ত্র এবং পাম্পিং মেশিন ব্যবহার করে নেপালি উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গ থেকে বাইরের নদী পর্যন্ত একাধিক নালা বা ড্রেন কেটে দেন, যাতে জমে থাকা পানি বাইরে বের হতে পারে। অবশেষে সুড়ঙ্গের উপরের অংশের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে তারা একজন মানুষ ঢুকতে পারেন এমন একটি সরু পথ তৈরিতে সক্ষম হন।

সেই সরু পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকেই শুক্রবার ভোরে উদ্ধারকারীরা মানুষের গলার আওয়াজের মত কিছু শুনতে পান। উদ্ধারকারীরা চিৎকার করে তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।

এর উত্তরে উদ্ধারকারীরা সুরঙ্গের ভেতর থেকে একটি ক্ষীণ আওয়াজ শোনেন। কেউ তাদের বলে- “ঠিক আছে”।

এর কিছুক্ষণ পরই তারা সঞ্জয় শাহ এবং কবির মহার্জন নামে দুই শ্রমিককে সুরঙ্গ থেকে জীবিত বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।

উদ্ধারকারীরা বলছেন, এখনও সুরঙ্গটিতে ডজন খানেক মানুষ আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে এখনো উদ্ধারকাজ শেষ হতে অনেক দেরি হবে।

আর্ডনল্ড ডিক্স অনুমান করছেন, তারা এ পর্যন্ত সুরঙ্গের প্রবেশপথ থেকে প্রায় ৬০ মিটার ভেতরে খুঁড়ে পৌঁছেছেন। পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত মূল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছাতে তাদের আরও ১৫০ মিটার খনন করতে হবে।

উদ্ধারকাজে থাকা নেপাল সেনাবাহিনীর কর্নেল ঝাবিন্দ্র রেশমি বিবিসিকে বলেছেন, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে কাদা ও পাথরের কারণে সুড়ঙ্গগুলোতে প্রবেশ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফটোকার্ড ডাউনলোড

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com