বিশেষ প্রতিবেদক:
ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের (ডিপিএইচই) ‘মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প’-এর বিতর্কিত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) তবিবুর রহমান তালুকদার বহাল তবিয়তে থাকায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু তাই নয়, অসম্পূর্ণ প্রকল্পের সময় এবং অর্থ আরও এক বছরের জন্য বাড়ানোর চলমান প্রক্রিয়া বিভাগের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, যদি তাবিবুর বর্ধিত প্রকল্পে আরও বেশি সময় ধরে থাকেন, তাহলে প্রকল্পের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারে। এছাড়াও এটি দুর্নীতি, ঘুষ এবং অনিয়মের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হতে পারে। তবিবরকে এই পদ থেকে অপসারণ না করা হলে বাড়তে পারে দূর্ণীতির ক্ষেত্র।
ঘুষ, দুর্নীতি এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন তবিবুর রহমানকে ১,৮৮৯ কোটি টাকার আরেকটি নতুন স্যানিটেশন প্রকল্পের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হতে চলেছে। এ নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভের।
প্রায় ১,৮৮৩ কোটি টাকার প্রথম প্রকল্পটি ২০২১ সালের জানুয়ারীতে শুরু হয় এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পিডি মো. তবিবুর রহমান তালুকদার এবং তার সহযোগীদের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হয়নি বলে সূত্র জানায়।
ফলস্বরূপ, আরও এক বছর সময় বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যেই প্রথম প্রকল্পের আশীর্বাদে তবিবুর দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বাড়ি তৈরি করেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু ফ্ল্যাট, প্লট এবং জমি কিনেছেন।

সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সদর হাসপাতাল রোডে বিলাশবহুল বাড়ি
যদিও তিনি সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, তবুও বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার সদর হাসপাতাল রোডে তার একটি ছয় তলা বাড়ি রয়েছে। তার বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি রয়েছে।
স্থানীয়ভাবে অনেকেই তাকে একজন নারী লোভী এবং বিবাহ পাগল হিসেবে চেনেন। বর্তমানে তার কতজন স্ত্রী আছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তার একজন স্ত্রী আছে, যিনি সিরাজগঞ্জ শহরের ওপেল গার্ডেন এলাকায় থাকেন, যিনি একজন স্কুল শিক্ষিকা হওয়া সত্ত্বেও একটি দামি জিপ গাড়ী ব্যবহার করেন। যদিও তবিবুর লোকেদের বলেন যে, সদর হাসপাতাল রোডের বাড়িটি তার ভাই হাবিবের, তিনি (তবিবুর) আসলে নিজেই বাড়িটির মালিক। সেখানেও তার একজন স্ত্রী আছে, যিনি বাড়ির দেখাশোনা করেন বলে স্থানীয়রা জানান।
ঢাকায় তার আরও দুটি স্ত্রী আছে, যারা পৃথক বাড়িতে থাকেন। ঢাকার ধানমন্ডির ৪/এ রোডে অবস্থিত ৩৯ নম্বর বাসার এ/২ নম্বর ফ্ল্যাটের মালিক তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে, তবিবুরের এক সহকর্মী জানান, যেখানেই তাকে বদলি করা হয়েছে, সেখানেই তিনি বিয়ে করেছেন। তার লক্ষ্য অফিসের সুন্দরী নারী অথবা দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী নারী। তার নেশা হলো প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করা। তাছাড়া জনশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি প্রায় নিয়মিত মদ্যপানের জন্য বিভিন্ন বারে যাতায়াত করেন।
সূত্র জানিয়েছে যে, মোহাম্মদপুর এবং গুলশানের ইকবাল রোডেও তার ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়াও তার কাছে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি হোন্ডা সিআর-ডি বিলাসবহুল গাড়ি আছে, যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ ১২-৭৩৬৭। তিনি ঘুষের টাকা দিয়ে ধানমন্ডির স্টার কাবাবের কাছে একটি বাড়ি এবং একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং তার নিজ শহর সিরাজগঞ্জে কমপক্ষে দশ একর জমি কিনেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে থাকেন। পাবনা, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জ সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় তার কর্মস্থল ছিল।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালের শেষের দিকে তবিবুর রহমান ঢাকায় আসেন এবং আটটি বিভাগের ৩০টি জেলার ৯৮টি উপজেলায় চলমান বহুল আলোচিত প্রকল্পের পিডি হন।
কাজের মধ্যে ৮০ শতাংশ টয়লেট ব্যবহারের উপযোগী নয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের বেশিরভাগ টয়লেট ক্লিনিক থেকে অনেক দূরে অবস্থিত হওয়ায় ব্যবহারের উপযোগী নয়। পানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত পাইপগুলি অত্যন্ত নিম্নমানের। বেশিরভাগই ইতিমধ্যে অকেজো হয়ে পড়েছে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে টেন্ডার কারসাজি, ঠিকাদারদের সাথে ১০-২০ শতাংশ চুক্তির মাধ্যমে কাজের আদেশ, ঘুষ দিয়ে নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ, প্রকল্প ক্রয়ের জন্য জাল বিল-ভাউচার ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ, আউটসোর্সিং নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ এবং পরামর্শদাতা সংস্থা নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিময়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পিডি মো. তবিবুর রহমান এই প্রকল্প থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিন কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। যদি তাকে এই প্রকল্পে বহাল রাখা হয়, তাহলে প্রকল্পটি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দুর্নীতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, যদি প্রকল্পের অর্থ এবং সময় বাড়ানো হয়, তাহলে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তিনি মনে করেন তবিবুর রহমানের পরিবর্তে অন্য কাউকে পিডি হিসেবে নিয়োগ করা ভালো হবে।
এই প্রতিবেদক এই বিষয়ে তার মন্তব্যের জন্য তার সাথে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।