স্টাফ রিপোর্টার॥
হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলার কারণে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ অংশ বিশেষ করে যমুনা বহুমুখী সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে চাঁন্দাইকোনা পর্যন্ত এলাকা ক্রাইম জোনে পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে উদ্বেগ বেড়েছে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে।
পরিবহন চালক, হেলপার এমনকি যাত্রীরাও মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অনেকেই জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা যেমন তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
৩ অক্টোবর গভীর রাতে যমুনা বহুমুখী সেতুর পশ্চিম পাশে ঝাঐ ল ওভারব্রিজের কাছে একটি প্রাইভেটকার থামিয়ে ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ঘটনায় এক মহিলাসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। সেই সময় দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ১৪ থেকে ১৫ জনের একটি দল প্রাইভেটকারটি ভাঙচুর করে, যাত্রীদের উপর হামলা করে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে।
২১ নভেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাদেকুল ইসলামের মালিকানাধীন ৭৫ ড্রাম পাম তেল বোঝাই একটি ট্রাক যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে ডাকাতদের একটি দল ছিনতাই করে। ডাকাত দলটি ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ট্রাকটিকে একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিষয়টি টের পেয়ে রায়গঞ্জ থানার আওতাধীন পেট্রোল পুলিশের একটি দল ট্রাকটিকে ধরার জন্য ধাওয়া করে। কোনও উপায় না পেয়ে ডাকাতরা হাটিকুমরুল এলাকার সমবায় ফিলিং স্টেশনের কাছে ট্রাকটি রেখে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ ডাকাতদের হাত থেকে ট্রাকটি উদ্ধার করে, কিন্তু থানার কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের যোগসাজসে ট্রাকের তেল উধাও হয়ে যায়। জব্দ তালিকায় ট্রাকটি যুক্ত করা হলেও সেখানে তেলের বিষয়টি সেখানে উল্লেখ ছিল না।
ট্রাক মালিক সাদেকুল ইসলামের মতে, পুলিশ কালোবাজারে পাম তেল বিক্রি করে দিয়েছে এবং আদালতে শুধুমাত্র খালি ট্রাক জব্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু, সেখানে তেলের কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি।
ট্রাক মালিক সাদেকুল অভিযোগ করেছেন যে, রায়গঞ্জ থানার তৎকালীন অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) কেএম মাসুদ রানা এবং সাব-ইন্সপেক্টর ফিরোজ একে অপরের সাথে যোগসাজশে উল্øেখিত পরিমাণ তেল মালিকের সম্মতি ছাড়াই অন্যত্র বিক্রি করে দিয়েছেন। কোনও উপায় না পেয়ে ট্রাক মালিক সাদেকুল পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি আলোচনায় আসার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সচেতনমহল প্রশ্ন তোলেন যে, যদি রক্ষকরা (পুলিশ) ভক্ষকে পরিণত হয়, তাহলে মানুষ কোথায় নিরাপত্তা এবং ন্যায় বিচার পাবে?
শুধু ডাকাতি বা ছিনতাই নয়, স্থানীয় এবং হাইওয়ে থানা পুলিশের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে মহাসড়ক দিয়ে মাদক পরিবহন একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-১২ এবং পুলিশ প্রায়শঃ মাদকদ্রব্য বিশেষ করে গাঁজা, ইয়াবা এবং ফেনসিডিল উদ্ধার করে, তবুও মাদক পরিবহনের অনুপাতের তুলনায় এই উদ্ধারের পরিমাণ সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে যে, উদ্ধারকৃত বেশিরভাগ মাদক এবং অবৈধ পণ্য জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে প্রায়ই কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা এবং তাদের তথাকথিত সোর্স এই অপকর্মের সাথে জড়িত বলে সূত্র দাবী করেছে।
সর্বশেষ গত শনিবার সিরাজগঞ্জ সদর থানা পুলিশ কড্ডার মোড়ের কাছে মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে একটি পিক-আপ ভ্যান থেকে ৪৩ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে, যার আনুমানিক মূল্য ১৭ লক্ষ টাকা বলে জানিয়েছেন পুলিশ। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ এই তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে, মহাসড়কে র্যাবের উদ্ধার কাজ পুলিশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি। র্যাবের দেয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, যমুনা সেতু পশ্চিম গোলচত্বরে অভিযান চালিয়ে ৫১ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারিকে আটক করেছে র্যাব-১২। মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব-১২-এর উপ-অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মেজর মো. ফারহান-উজ-জামানের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
জুলহাজ হোসেন নামে একজন ট্রাক চালক বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজনীয় নজরদারির অভাবে মহাসড়কটি মাদক চোরাচালানকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। অভিযান চালালে কোন না কোন মাদক উদ্ধারের ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়তই দেখা যায়। এছাড়াও মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ অংশ ডাকাত, ছিনতাইকারী এবং অপহরণকারীদের মতো অপরাধীদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই, রাতে এলাকাটি অতিক্রম করার সময় আমরা সর্বদা নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হই, কারণ রাতে মহাসড়কটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।”
বগুড়া সার্কেলের হাইওয়ে পুলিশ সুপার শহীদুল্লাহ সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মহাসড়কটিকে নজরদারির আওতায় আনার জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।
সিসিটিভি ক্যামেরার গুরুত্ব অনুধাবন করে শহীদুল্লাহ তার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়া জেলার অভ্যন্তরে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। তবে, প্রয়োজন অনুসারে তা যথেষ্ট নয় বলে তিনি মনে করেন।
অবহেলা এবং অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে হাটিকুমুরল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, “মাদক পরিবহন বা অপরাধ সংঘটনের আগে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক পাচার রোধ করা কঠিন। আমরা অপর্যাপ্ত জনবল নিয়ে কাজ করছি। তথাপী আমরা রাতের বেলায় ৩ টার দিকে বিভিন্ন সন্দেহজনক যানবাহনে টহল এবং তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করি।”
তবে তিনি গ্রেপ্তার, উদ্ধার এবং প্রাসঙ্গিক মামলার সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে ব্যর্থ হন।