স্টাফ রিপোর্টার॥
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন অফিস যখন তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে, ঠিক একই সময়ে জনবলশূন্যতায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অফিস বন্ধ থাকছে। সেখানে দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এক প্রকার সুনসান নীরবতা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা নারীরা অফিস বন্ধ পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে চলনবিল অধ্যুষিত মানুষের নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না সরকারের এ দপ্তরটি। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না উপজেলার দায়িত্ব থাকা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান। পরে অবশ্য এ প্রতিবেদক বিষয়টি তাকে জানালে খোঁজখবর নেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতা, সঠিক তদারকির অভাব, দায়িত্ববোধ না থাকায় এবং অবহেলার কারণেই এ দপ্তরের এ অবস্থা হয়েছে। এ সমস্যার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন সচেতন মহল। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল নিয়োগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের প্রধান কাজ হলো, নারীদের কল্যাণ, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, দুস্থ ও কর্মহীন নারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কিশোর-কিশোরীদের অংশ নিতে সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু এ উপজেলায় কোনো কর্মচারী না থাকায় ভাটা পড়েছে ওই সব সেবামূলক কার্যক্রমে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সুবিধা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে এ উপজেলার নারীরা। বর্তমানে এ দপ্তরে জনবল নিয়োগ জরুরি হলেও তেমন গুরুত্ব নেই কর্তৃপক্ষের।
বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হয় জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে দায়িত্ব থাকা হিসাবরক্ষক ও ক্রেডিট অফিসার বাবুল আক্তার খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তাড়াশ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে বর্তমানে কোনো লোকবলই নেই। এর আগে একজন কর্মকর্তা, একজন অফিস সহকারী ও একজন পিয়ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে একজনও নেই। এর কারণে অফিস সব সময় বন্ধ থাকে। যত দিন পর্যন্ত লোকবল নিয়োগ না দেওয়া হবে, তত দিন এ অবস্থা চলতে থাকবে। আমাদের কিছুই করার নেই।’
তাড়াশ উপজেলার ভেতরের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অনেকগুলো রুম নিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন তাড়াশ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরটি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অফিসে কেউ নেই, সুনসান নীরবতা এবং প্রতিটি রুম তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অফিসে সেবা নিতে আসা নারীরা অফিসে কাউকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তবে পাশেই রয়েছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যালয়। সেখানকার অফিস সহায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর অফিসটি সব সময় বন্ধ অবস্থায় থাকে। তাদের কার্যক্রম কিভাবে চালায়, আমার জানা নেই। তবে মাঝে মধ্যে আবু বক্কার নামে একজন লোক আসেন। কিন্তু সে অফিসের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী নন।
তাড়াশ মহিলা অধিদপ্তরে সেবা নিতে পাঁচান গ্রাম থেকে আসা নারী আকলিমা খাতুন বলেন, ‘দুই ঘণ্টা ধরে বসে রয়েছি। এখন পর্যন্ত একজন অফিসার ও একজন পিয়নও এল না। তাই অপেক্ষা করে বাড়ি চলে যাচ্ছি।’
উপজেলার হামকুড়িয়া গ্রাম থেকে আসা আরেক সেবাপ্রত্যাশী রহিমা খাতুন বলেন, ‘এর আগে দুই দিন এসে ঘুরে গেছি। সেদিনও অফিস বন্ধ ছিল, আজকেও গাড়ি ভাড়া খরচ করে এসেছি। আজও অফিস বন্ধ পেলাম। দেড় ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। অথচ একজন কর্মচারীও আসেনি।’
সেবা নিতে আসা আরেক নারী মরিয়ম খাতুন অভিমান করে বলেন, ‘লোকবল নেই, তাই সেবা বন্ধ’- এটা লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেই তো হয়। তা হলে বিষয়টি মানুষ জানতে পারবে। তা হলে অফিস খোলার অপেক্ষা আর করবে না।
উপজেলার দোবিলা গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম ও আনন্দ কুমার রবিদাস বলেন, ‘এ রকম অনিয়ম, অবহেলা করলে জনগণ কোথায় যাবে? এসব কর্মীর দায়িত্বহীনতার কারণে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে রায়গঞ্জ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও তাড়াশ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকা কর্মকর্তা খাদিজা নাছরিন বলেন, ‘অফিসে কেউ নেই। এ জন্য বন্ধ থাকে। তবে সেখানে আমি মাঝে মধ্যে যাই। আমি যেহেতু একটি উপজেলার দায়িত্বে আছি, তাই সবকিছু করা আমার পক্ষেও সম্ভব নয়। এটা নিয়ে অনেকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আমি নিজেই অতিরিক্ত দায়িত্ব ছাড়ার জন্য আবেদন করেছি।’
জেলা স্বার্থরক্ষা কমিটির সাবেক সদস্য নবকুমার কর্মকার বলেন, ‘জেলার সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী নারী রয়েছে তাড়াশ উপজেলায়। সেখানেই যদি জনবলের শূন্যতায় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের অফিশিয়াল কার্যক্রম বন্ধ থাকে, সেটা খুবই দুঃখজনক। অবিলম্বে সেখানে লোক নিয়োগ দিয়ে নারীদের সেবামূলক কার্যক্রম বাড়ানো উচিত। লোক নিয়োগ দেওয়ার পরও যদি সেখানে কেউ যোগ না দেন, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
এ ব্যাপারটি জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘ওই অফিসে একজনও না থাকায় কার্যক্রম নেই। আপনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তিনি ওই উপজেলার প্রধান। এ বিষয়টি তার দেখার দায়িত্ব রয়েছে।’
এদিকে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, তাড়াশ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরে যে লোকবলশূন্যতা রয়েছে, এটা তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে।