রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সরকার বরাদ্দ দেয় সুরক্ষার জন্য, বালুদস্যুরা গ্রাস করে পৈতৃক সম্পত্তির মতো..! হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে, ১৬ই ডিসেম্বর উদ্বোধনের সম্ভাবনা নির্বাহী প্রকৌশলীর কেরামতি, দুর্নীতি ধুয়ে ৭ দিনেই ‘পবিত্র’ সিরাজগঞ্জে ডিপিএইচই-এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট: সময় ও খরচ বেড়েছে, অগ্রগতি আটকে আছে একই জায়গায় ‘এক কোটি ২৮ লাখ তো নিছেন আপনারা সবাই’, সেই অডিওতে ফেঁসে গেছেন পুলিশ কর্মকর্তা ডিপিএইচই: অবশেষে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে পিডি তবিবর সাময়িক বরখাস্ত সারা দেশে ইন্টারনেট নিয়ে দুঃসংবাদ দিল বিএসসিসিএল শজনে ভেবে লাজনা খাচ্ছেন কি? দুটির পার্থক্য জেনে রাখুন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯: বঞ্চিত তথ্য প্রত্যাশীরা হতাশ রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউর অপেক্ষায় এক মাসে ৯১ শিশুর মৃত্যু

ফিরে দেখা : পঁচিশের অর্থনীতি – শেষ পর্ব: অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগে সুশাসন উপেক্ষিত থাকছে কি

  • আপডেট সময় বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩.৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত


টিডিএস ডেস্ক॥



আজ শেষ হতে যাওয়া ২০২৫ সালজুড়েই দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সংস্কার। প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টিও এ সময় আলোচিত হয়েছে বিপুলভাবে। যদিও বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার তীব্র দাবিটিই থেকেছে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। সুশাসন হলো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় এমন একটি ব্যবস্থা; যেখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ছিল সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের অর্থের সঠিক ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত হবে। দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাট বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অবারিত সুযোগ থাকবে। আইনের চোখে সব নাগরিক হবে সমান। কিন্তু বিদায় হতে যাওয়া বছরে এসব প্রত্যাশা পূরণের কোনো অগ্রযাত্রা দেখা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সময়ে সরকারের পরিচালন ব্যয়ে সাশ্রয় হয়নি। বরং বিগত দেড় দশকের ধারাবাহিকতায় ঋণের বোঝা আরো বেড়েছে। বিপরীতে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হয়নি। কর-জিডিপির অনুপাত আরো কমে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ব্যয় কমাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও সচিবের সংখ্যা কমিয়ে ৬০ করার সুপারিশ থাকলেও এক্ষেত্রে সরকার হেঁটেছে উল্টো পথে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় আরো বাড়ানো হয়েছে।

রাষ্ট্র মেরামতের নামে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করেছে সরকার। এ সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও গত এক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বশাসিত ২৩২ প্রতিষ্ঠান সংস্কারে কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটির বাস্তবায়ন হয়নি। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেটিও আটকে গেছে। পুঁজিবাজার, বীমা খাতসহ আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও সুশাসন ফেরানোর কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর নীতি অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নীতির প্রভাবে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ থমকে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ সুদের চাপে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝাও ভারী হচ্ছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এসে সাম্প্রতিক সময়ে উল্টো বেড়ে যাচ্ছে। বিপরীতে কমে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ফলে বাড়ছে ধনী-গরিবের সম্পদের বৈষম্যও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, অনিয়ম-দুর্নীতি কমবে। কিন্তু বিদায় হতে যাওয়া বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড কিছু নীতিগত সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। সেসব নীতি সংস্কার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। সরকারি সেবা গ্রহণে ঘুসের লেনদেন কমেনি। সরকারি কেনাকাটায়ও আগের মতোই দুর্নীতি হচ্ছে। টেন্ডার ছাড়াই পছন্দের ব্যক্তিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও নীতিনির্ধারকদের পছন্দের ব্যক্তিরা প্রাধান্য পেয়েছেন। আবার দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব দেখা গেছে। ৭০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি দুটি পুরনো ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

দেশে অর্থনৈতিক সুশাসনের অবস্থা নাজুকই থেকে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ  বলেন, ‘দেশের সব প্রতিষ্ঠানই গত দেড় দশকে ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি আরো খারাপ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে বিশেষ নিরীক্ষা করতে পারত। কিন্তু আমরা কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নিরীক্ষা দেখিনি। বিবিএসসহ সরকারি তথ্য-উপাত্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দেয়া তথ্যের মানও আগের অবস্থায় রয়ে গেছে। সরকারি সেবা পেতে এখনো জনগণকে আগের মতোই ঘুস দিতে হচ্ছে। তাহলে সুশাসনের পরিস্থিতির উন্নতি কোথায় হলো?’

সরকারি ব্যয়ের অস্বচ্ছতা নিয়েও নিজের হতাশার কথা জানান ড. মোস্তফা কে মুজেরী, ‘আমাদের প্রশাসন মাথাভারী। এখানে চরম দুর্নীতিও বিদ্যমান। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই। আমরা দেখছি, আমলাতন্ত্রের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেই সরকারের ব্যয় বেশি বাড়ছে। যেসব খাতে ব্যয় করা হলে হতদরিদ্র ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী উপকৃত হতো যেমন কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, সেখানে ব্যয় না বেড়ে গত এক বছরে উল্টো কমেছে।’

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডের ভূমিকা রাখা এ খাতটি থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সে ক্ষত বেরিয়ে এসেছে। কেবল ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। যদিও নবম জাতীয় সংসদ বিজয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।

দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ১৭টিরই খেলাপি ঋণের হার এখন ৫০ শতাংশের বেশি। এর কোনো কোনোটির ৮০-৯৮ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে। আর ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যাও আটটি। খেলাপি ঋণের এ সংখ্যাও প্রকৃত চিত্র নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ বেসরকারি বাকি ব্যাংকগুলোর ফরেনসিক অডিট করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বাড়বে।

দেশের অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে তাড়না ছিল, সেটি অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।  তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতিসহ করপোরেট খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। শুরুর দিকে এ বিষয়ে বেশ তোড়জোড়ও ছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে সে তাড়না দেখছি না। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেটির বাস্তবায়ন এখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের উদ্যোগও আটকে গেছে। বিপর্যস্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত হলো, কিন্তু এর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্নীতির লাগাম টেনে অর্থনীতিতে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলে সব উদ্যোগই ভেস্তে যাবে।’

ব্যাংক খাতসহ দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা মিশ্র বলে মন্তব্য করেন এ জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার। তিনি বলেন, ‘বিদায় হতে যাওয়া বছরে দেশের এক্সটারনাল খাতের উন্নতি ভালো। ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে, রিজার্ভ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সমাধান হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বাজার থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী, বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি খুবই খারাপ, কর্মসংস্থানের অবস্থা পুরোপুরি স্থবির, ব্যাংকের এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কোনো উন্নতি হয়নি। দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পড়ে যাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কোনো সুসংবাদ নেই। অভ্যন্তরীণ এতসব সংকট কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন।’

অন্যদিকে ব্যাংক খাতের জন্য বিদায় হতে যাওয়া বছর সবচেয়ে খারাপ গেছে বলে মনে করেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ।  তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা কখনো দেখিনি, এতগুলো ব্যাংক একযোগে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হারও প্রায় ৪০ শতাংশে ঠেকেছে। বিরাজমান এ সংকট গত দেড় দশকের অনিয়ম-দুর্নীতির ফল। ব্যাংক খাত থেকে এত টাকা পাচার হয়ে গেছে, সেটি আমরা বুঝতেও পারিনি। গোটা বিশ্বে এখন বাংলাদেশের ব্যাংক খাত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে। বিদেশী ব্যাংকগুলো ঋণপত্রের (এলসি) কমিশন বাড়িয়ে দিচ্ছে। একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহক আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য রাস্তায় ঘুরছে। এ পরিস্থিতি থেকে দেশের ব্যাংক খাতসহ অর্থনীতিকে দ্রুত বের করে আনতে হবে। অন্যথায় ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।’

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম আলাদা করার জন্য গত ১২ মে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। এতে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে পৃথক দৃটি বিভাগ গঠনের কথা বলা হয়। এ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এক পর্যায়ে আন্দোলনের প্রভাবে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ায় অচলাবস্থা নেমে আসে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমও ব্যাহত হয় মারাত্মকভাবে। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যায় সরকার। বেশকিছু পরিবর্তন এনে গত ১ সেপ্টেম্বর সরকার সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করে। তবে অধ্যাদেশ সংশোধনের পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এর বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি কর কাঠামোর জটিলতা এখনো বিদ্যমান। সেই সঙ্গে এনবিআরের সুশাসনের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে এনবিআরের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিতের বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজস্ব নীতি সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ  বলেন, ‘এনবিআরের কার্যক্রম পৃথক্করণের জন্য আমাদের কমিটির পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ দেয়া হয়েছিল, সরকার এর অর্ধেক বিবেচনায় নিয়েছে আর বাকি অর্ধেক বিবেচনায় নেয়নি। ফলে এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়েছে এবং এ কারণে এটি এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অটোমেশন পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অটোমেশনের আগে আইনগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যবসার প্রক্রিয়াকে কীভাবে আরো সহজ করা যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। কর অব্যাহতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। করপোরেট করহারের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি এটিকে আরো সহনীয় করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়া কিংবা অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এনবিআরের কর্মীরা রাজস্ব আহরণে সবচেয়ে কম শ্রম দিয়ে থাকেন। এটি বাড়াতে হবে। এনবিআর ভয়ভীতির কোনো জায়গা নয়। কিন্তু মানুষের মনে এখনো এনবিআর-ভীতি রয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেসব উত্তম চর্চা রয়েছে, সেগুলো আমাদের এখানেও চালু করতে হবে। যারা ফাঁকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সবাই যাতে সহজে কর দিতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা যাতে বাড়ে সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এসব বিষয়ে এ বছর তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা না গেলেও ২০২৬ সালে নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক্ষেত্রে উদ্যোগ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।’

পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে অনিয়ম, কারসাজি ও লুটপাটের কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধ্বংসের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে গতি ফিরে আসার প্রত্যাশায় ছিলেন তারা। যদিও তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং আরো তলানিতে নেমেছে দেশের পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজারে সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিতের ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও সে অনুসারে এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে বাজার অংশীজনদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের বিষয়টি বছরজুড়েই আলোচনায় ছিল। তিনটি বিধিমালা সংস্কারের মাধ্যমে নতুন করে প্রণয়ন করতে গিয়েও অংশীজনদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে কমিশনের। কর্মচারীদের সঙ্গেও কমিশনের আস্থার সংকট দৃশ্যমান ছিল। তাছাড়া কারসাজির দায়ে অনেককে বড় অংকের জরিমানা করা হলেও তা আদায় করা সম্ভব হয়নি। বাজার অংশীজনদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করার কারণেও সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। পুরো বছরজুড়ে নতুন কোনো আইপিও আসেনি। সূচক ও লেনদেন আরো তলানিতে নেমেছে। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে হতাশাজনক একটি সময় পার করেছেন পুঁজিবাজারে অংশীজন ও বিনিয়োগকারীরা।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘২০২৫ সালের পুরোটা সময় সরকারকে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা খারাপ ছিল। গত দেড় বছরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থনীতি, ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের অবস্থা ভালো হবে না এটা কামনা করাই সমীচীন। গত এক বছর দেশের পুঁজিবাজার হতাশাজনক অবস্থায় আছে। নানা ধরনের সংস্কারের কথা বলা হলেও এক্ষেত্রে শুধু সময়ক্ষেপণ হয়েছে, কাজের কাজ কিছু হয়নি। সামনের বছর যদি একটি ভালো নির্বাচন হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি সরকার আসতে পারে তাহলে আমার মনে হয় অর্থনীতি ধীরে ধীরে ভালো হবে, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং এতে পুঁজিবাজারেও আস্থা ফিরে আসবে।’

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com