চালকল মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দূর্ণীতি ও অনিয়ম প্রকাশ হওয়ায় দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তাগণ নিজেদের পীঠ বাঁচাতে চালকল মালিকদের দিয়ে অভিনব কায়দায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করাচ্ছেন। সোহাগ সরকার যদি চাঁদা চেয়ে থাকেন, তাহলে তা ফৌজদারী অপরাধ। মিল মালিকদের কাছে যদি প্রমাণ থাকে, তাহলে তারা প্রমাণ উপস্থাপনসহ চাঁদাবাজীর মামলা করতে পারেন। মানববন্ধন করে মিল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি -ধামকি প্রমাণ করে যে, তাদের ভিতরে দূর্ণীতি ও অনিয়ম আছে। সুতরাং জেলা প্রশাসনের এবং উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের উচিত হবে, সূষ্ঠ তদন্ত করা। তা না হলে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।
বিশেষ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে কাগজপত্রে অস্তিত্ব থাকা ‘ভূতুরে’ ও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা চালকলের নামে সরকারি চাল বরাদ্দ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও বিক্ষোভ-পাল্টা বিক্ষোভ প্রদর্শিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ:
অভিযোগের তীর সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসিএফ) হারুন-অর-রশীদ এবং রায়গঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ইউসিএফ) সিরাজুল ইসলাম সরকারের দিকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রায়গঞ্জ উপজেলার ১৪২টি নিবন্ধিত চালকলের মধ্যে ১৩৭টিকে ১২ হাজার টন সেদ্ধ চাল সরবরাহের চুক্তি ও বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতি টন চালের সরকারি মূল্য ৪৯,০০০ টাকা হিসেবে এই বরাদ্দের মোট আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা (৫৮৮.৯ মিলিয়ন টাকা)।
তবে স্থানীয় চালকল মালিক ও বাসিন্দাদের দাবি, বরাদ্দ পাওয়া ১৩৭টি মিলের মধ্যে অন্তত ৭০টি মিলের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। ভুয়া ও ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র বানিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এসব ‘ভূতুরে’ মিলের নামে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বন্ধ মিলের নামে শত শত টন চাল বরাদ্দ:
তদন্তে দেখা যায়, বছরের পর বছর বন্ধ থাকা মিলগুলোর নামে বড় অঙ্কের চাল বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।
লুতফা ও ওমর সেমি অটো রাইস মিল: গত এক দশক ধরে বন্ধ থাকা সত্ত্বেও একই পরিবারের (বাবা ও ছেলে) ৪টি লাইসেন্সের বিপরীতে ১৪৭ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আনোয়ারা ও সারা মিলস: চালকল মালিক সমিতির এক প্রভাবশালী নেতার মালিকানাধীন এই কলগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বরাদ্দ পেয়েছে ১৬৪ টন চাল।
মামা-ভাগ্নে, খাজা ও আকন্দ রাইস মিল: বিগত দেড় দশক ধরে বন্ধ থাকা এসব মিলের নামে যথাক্রমে ২০৯ টন, ১৯১ টন এবং ৬২ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।
বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভ:
অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ ওঠে।
১২ আগস্ট: অভিযুক্ত মিল মালিকরা চান্দাইকোনা এলাকায় এক মানববন্ধনের আয়োজন করেন। সেখানে তারা দাবি করেন, স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহাগ সরকার তাদের কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। চাঁদা না পেয়ে তিনি সাংবাদিকদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে এসব সংবাদ প্রকাশ করিয়েছেন।
১৩ আগস্ট: এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ী সোহাগ সরকারের নেতৃত্বে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অন্য একটি মানববন্ধন করেন। সেখানে ভুয়া মিলের নামে বরাদ্দপ্রদানকারী কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী চক্রের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
২৩ আগষ্ট: জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মিলমালিকগণ আবারো মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলীপি প্রদাণ করেন চাঁদাদাবীর অভিযোগ আনেন সোহাগ সরকারের বিরুদ্ধে।
বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য:
রায়গঞ্জ উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মোতালেব শেখ: “চাঁদা না পেয়ে সোহাগ সরকার সাংবাদিকদের ভুল তথ্য ও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে উস্কে দিয়েছেন। আমরা তারই প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছি।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক দীপক কুমার কর: “কাগজপত্রে ১৪২টি নিবন্ধিত মিলের কথা বলা হলেও বাস্তবে অন্তত ৬০ থেকে ৭০টি মিলের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।”
ব্যবসায়ী সোহাগ সরকার: “তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের পক্ষে প্রতিবেদন নেওয়ার জন্য প্রভাব বিস্তার করছেন। হারুন ও সিরাজুল—এই দুই খাদ্য কর্মকর্তাকে দ্রুত অপসারণ করতে হবে। তা না হলে কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে।”
সাধারণ জনগনের বক্তব্য: সাধারণ জনগণ বলছেন, চালকল মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দূর্ণীতি ও অনিয়ম প্রকাশ হওয়ায় দূর্ণীতিবাজ কর্মকর্তাগণ নিজেদের পীঠ বাঁচাতে চালকল মালিকদের দিয়ে অভিনব কায়দায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করাচ্ছেন। সোহাগ সরকার যদি চাঁদা চেয়ে থাকে, তাহলে তা ফৌজদারী অপরাধ। মিল মালিকদের কাছে যদি প্রমাণ থাকে, তাহলে তারা প্রমাণ উপস্থাপনসহ চাঁদাবাজীর মামলা করতে পারেন। মানববন্ধন করে মিল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি ধামকি প্রমাণ করে যে, তাদের ভিতরে দূর্ণীতি ও অনিয়ম আছে। সুতরাং জেলা প্রশাসনের এবং উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের উচিত হবে, সূষ্ঠ তদন্ত করা। তা না হলে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।
অভিযুক্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন-অর-রশীদ: অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি ওমরাহ পালন করেছি এবং নিয়ম মেনেই সব কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা কারো নেই।”
পরিবেশ অধিদপ্তর সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম: “বেশিরভাগ চালকলেরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। তা সত্ত্বেও কীভাবে বরাদ্দ পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”
তদন্ত কমিটি গঠন:
বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নির্দেশে রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজ শেষ করতে সম্প্রতি আরো ১৫ দিন সময় চেয়ে আবেদন করেছেন । স্থানীয়রা আশা করছেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা।