স্টাফ রিপোর্টার॥
যমুনা বহুমুখী সেতুর মাত্র ৩০০ মিটার উজানে চলতি বছর চালু হয় নতুন এক রেল সেতু। এবার এ দুই সেতুর কাছাকাছি দূরত্বেই আরো একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের সেতু বিভাগ। নতুন সেতুর সম্ভাব্য সমীক্ষার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিযুক্ত করা হয়েছে। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সমীক্ষার মাধ্যমে নতুন সেতুর সম্ভাব্য স্থান, কারিগরি চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পরিবেশগত বিভিন্ন দিক নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ সম্পর্কে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দুই পাশের সংযোগ সড়কের তুলনায় যমুনা সেতুর প্রশস্ততা কম। দেশে যানবাহন চলাচল যে হারে বাড়ছে, তাতে অদূরভবিষ্যতে এ পথে যাতায়াতে নতুন একটি সেতুর দরকার হবে। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য যমুনায় নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও কাছাকাছি জায়গায় এতগুলো অবকাঠামো নদীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা।
সেতু হওয়ার পর যমুনায় চর জেগে ওঠাসহ নদীর গতিপথে বিরূপ প্রভাব, নদীভাঙনের মতো পরিস্থিতি দেখা গেছে বলে জানান যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যমুনায় নতুন সেতু নির্মাণ করতে গেলে আবশ্যিকভাবে নদীশাসনের প্রয়োজন হবে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে। নতুন সেতু নির্মাণের জন্য সেতু বিভাগ যে সমীক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে তার পরই যেন সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।’
যমুনায় নতুন সেতু নির্মাণের জন্য সমীক্ষার কাজটি পেয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইইউটি-ডেভকন জয়েন্ট ভেঞ্চার। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৪ কোটি ২৯ লাখ টাকার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। নতুন সেতু নির্মাণ ছাড়াও যমুনা বহুমুখী সেতু প্রশস্ত করার জন্যও সমীক্ষা করবে আইইউটি-ডেভকন জয়েন্ট ভেঞ্চার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘দুটি কাজ একই ধরনের। এজন্য একটি পরামর্শককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’
নতুন সেতুর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দুই পাশে আট লেন রাস্তা হয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে যমুনা সেতু মাত্র দুই লেন। প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে চলাচল করা যানবাহন যখন দুই লেনের সেতুতে আসবে, স্বভাবতই যানজট পরিস্থিতি তৈরি হবে। এজন্য এখন যমুনায় একটি বিকল্প সেতুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যানেও এটা আছে।’
কোন স্থানে সেতুটি নির্মিত হবে—এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, ‘কোন জায়গায় হবে তা আসলে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বোঝা যাবে। কাছাকাছি দূরত্বে যেখানে সম্ভব হয়, সে রকম চিন্তা হয়তো সমীক্ষা থেকে উঠে আসবে। এটা বিদ্যমান সেতুর পাশে কিংবা ৫-১০ কিলোমিটার দূরেও হতে পারে।’
যমুনায় ৩০০ মিটারের মধ্যে এরই মধ্যে দৃটি বৃহৎ সেতু গড়ে তোলা হয়েছে। কাছাকাছি দূরত্বে আরেকটি সেতু হলে নদীর গতিপ্রবাহে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে কিনা, জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব বলেন, ‘আমাদের বিশেষজ্ঞ দল যমুনার গতিপ্রকৃতি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি দুই সেতুর প্রভাবে নদীতে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ছে, এমন কিছু এখনো আমাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসেনি। এখানে নতুন আরেকটি সেতু আসলে দরকার। আর একটা সেতু করতে কিন্তু অনেক সময়ের প্রয়োজন। এখন সমীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সমীক্ষার প্রতিবেদন আসুক। তখন জনমত যাচাই করে, বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়েই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।’
যমুনা নদীর ওপর ১৯৯৮ সালে উদ্বোধন করা হয় যমুনা বহুমুখী সেতু। ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এ সেতু সড়ক ও রেল সেতু হিসেবে এতদিন ব্যবহার হয়েছে। সম্প্রতি যমুনা সেতুর ৩০০ মিটার উত্তরে নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেল সেতু। পুরনো সেতু থেকে রেলপথ তুলে সেটির প্রশস্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রেলপথের কারণে যমুনা সেতু এতদিন পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যায়নি। এখন যেহেতু সুযোগ এসেছে, সেহেতু এ সক্ষমতা পুরোটা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান তিনি বলেন, ‘যমুনা সেতু থেকে রেল সরিয়ে নেয়ার ফলে সড়ক কিছুটা প্রসারিত হচ্ছে। এ সেতুর যে সক্ষমতা, এখনো তার পুরোটা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে এমন একটি অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার না হওয়াটা হতাশাজনক। এমন অবস্থায় নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণ কতটা যুক্তিযুক্ত সেটাও ভেবে দেখা জরুরি। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া যমুনা সেতুর দেশের জিডিপিতে যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, এখন পর্যন্ত কিন্তু তা পূরণ করতে পারেনি। নতুন সেতু নির্মাণের আগে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার।’