অনলাইন রিপোর্ট
একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে গত ১৫ জুলাই সীতাকুণ্ডের ‘ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের’ বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।
কিন্তু এরপরেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে শিপইয়ার্ডের কাজ চালানোর একপর্যায়ে আজ শুক্রবার বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় ওই প্রতিষ্ঠানের ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে আজ সকাল ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ডিআইএফইয়ের এক তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়ার্ডে নোঙর করা এলএনজি পরিবহন করা একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। কাজ চলাকালে হঠাৎ জাহাজের ভেতরে গ্যাস লিকেজ হয়ে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে।
এতে অক্সিজেনের অভাবে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও অনেক শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। পরে ঘটনাস্থলেই ৫ শ্রমিক মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৩ জন মারা যান।
বিকেলে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরেক শ্রমিক।
এ ঘটনায় আরও ১০-১২ জন শ্রমিক অসুস্থ ও গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ডিআইএফইয়ের প্রতিনিধি দল কারখানা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় উত্তেজিত জনতার মারধরে ২ শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।
একাধিক নোটিশ ও মামলা
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ডিআইএফই চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে কারখানাটি পূর্বে একাধিকবার পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ওই শিপইইয়ার্ডে গিয়ে কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান কর্মকর্তারা। এরপর এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়।’
‘এরপর কয়েক দফা তাগিদ দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে কারখানাটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়,’ বলেন তিনি।
পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে এ মামলাটি করেছিলেন।
অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার কারখানা পরিদর্শন করে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়।
এরপর ৪ মে আবার পরিদর্শন করে আগের নির্দেশনার অগ্রগতি না দেখে তাগিদ দেওয়া হয়।
পরে ৮ জুন চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তা জোরদারের চূড়ান্ত নোটিশ ও তাগিদপত্র দেওয়া হয়।
আজ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
স্থানীয় শ্রমিকনেতা ফজলুর কবির মিন্টু বলেন, ‘ওই জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করে শ্রমিকদের ঢোকানে হয়, যা মালিকপক্ষের গাফিলতি। তাছাড়া বন্ধের দিন সেখানে কাজ চলছিল। বিষয়গুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ওই শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, ‘এই অনুমতি শুধু পরিবেশ দেয় না। বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ আরও কিছু সংস্থার অনুমতি প্রয়োজন হয়। আর ওই কোম্পানির কোন জাহাজটির অনুমোদন আছে আর কোনটির নেই, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছি না। কারণ পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় আমাদের পরিদর্শক যেতে পারেননি। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।’