বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
লিবিয়ার ‘গেমঘর’ থেকে ফেরা দুই যুবকের লোমহর্ষক বর্ণনা সুন্দরবনের শতবর্ষী স্মৃতি ‘বনরানী’ ও ‘বনকন্যা’ বিক্রি পরীক্ষা নয়, এবারও ফলের ভিত্তিতে একাদশে ভর্তি এমন বিভেদ চললে শেখ হাসিনা তালি বাজাবেন : রিজভী আওয়ামী লীগ বিদেশ থেকে উঁকিঝুকিঁ দিচ্ছে, তৎপরতার মুরোদ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাজীপুরে ভূমি অফিসে ডিসি’র আকস্মিক অভিযান, চার কর্মকর্তা বরখাস্ত ছাগল–কাণ্ডের মতিউরের দুর্নীতি মামলার বিচার শুরু সম্মিলিত অংশগ্রহণেই পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী সমকামিতার অভিযোগ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধিতে কী আছে ক্ষেত থেকে ভোক্তা, কাঁচা মরিচের কেজিতে বেড়ে যাচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা

লিবিয়ার ‘গেমঘর’ থেকে ফেরা দুই যুবকের লোমহর্ষক বর্ণনা

  • আপডেট সময় বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ৪.২৮ পিএম
Photo by Correspondent

মাদারীপুর প্রতিনিধি



ইউরোপের দেশ ইতালিতে গিয়ে ভালো চাকরি করে সংসারের অভাব দূর করার স্বপ্ন ছিল তাঁদের। কিন্তু সেই স্বপ্নের পিছু ছুটতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন মাদারীপুরের দুই যুবক রাহাত তালুকদার (২৮) ও আরাফাত কাজী (২৫)। ইতালি পৌঁছানোর বদলে তাঁদের ঠিকানা হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার মানবপাচারকারীদের নির্যাতনকেন্দ্র বা কথিত ‘গেমঘর’-এ। সেখানে এক বছরের বন্দিজীবনে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর অবশেষে গত ৮ আগস্ট দেশে ফিরেছেন তাঁরা। বর্তমানে তাঁরা মাদারীপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
রবিবার (০৯ আগস্ট) সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই দুই যুবক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাঁদের ওপর নেমে আসা অমানুষিক নির্যাতনের নির্মম চিত্র।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউরে উঠছিলেন রাহাত তালুকদার। তিনি জানান, প্রতিদিন নিয়ম করে তিন বেলা তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। হাত-পা বেঁধে এবং মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে প্লাস্টিক ও লোহার পাইপ দিয়ে পেটানো হতো, যাতে চিৎকার বাইরে না যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর হাতের নখ পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়েছে। রাহাতের ভাষ্য অনুযায়ী, এক একটি কক্ষে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হতো এবং দিনে মাত্র এক বেলা খাবার দেওয়া হতো।
একই স্থানে বন্দি থাকা আরাফাত কাজীর শরীরেও রয়েছে মারাত্মক নির্যাতনের চিহ্ন। গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া এবং পায়ের তলায় পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করার কারণে তিনি এখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছেন না।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মার্চে স্থানীয় দালাল মজিবর শেখ, শামসু ফকির ও মাহাবুব মুন্সির মাধ্যমে মূল দালাল সুমন বেপারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে শুরুতে প্রায় ২২ লাখ টাকা চুক্তি হলেও লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর রাহাত ও আরাফাতকে স্থানীয় এক সশস্ত্র মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁদের ঠাঁই হয় এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির পরিচালিত ‘গেমঘর’-এ। সেখানে তাঁদের ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে দেশে স্বজনদের কাছে পাঠানো হতো এবং ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হতো।
সন্তানের ওপর এমন নির্মম নির্যাতনের ভিডিও দেখে কেঁদে ফেলেন রাহাতের মা মায়া বেগম। তিনি বলেন, “ভিডিও দেখে মনে হতো বুকের ভেতরটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে। ছেলেকে বাঁচাতে সব বিক্রি করেছি, ধারদেনা করেছি। অনেক দিন জানতামই না ছেলেটা বেঁচে আছে কি না। ছেলেকে ফিরে পেয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই, তবে আমরা এই দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
আরাফাতের ভাই মাহাবুব কাজী জানান, ভাইকে জীবিত ফেরত পেতে জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে দালালদের প্রায় ৫০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “টাকা দিয়েও ভাইকে ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। আমরা প্রতারক ও পাচারকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে টাকা উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি।”
মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামে অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ধরনের মানবপাচারের শিকার কেবল রাহাত বা আরাফাত নন; ওই গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক যুবক দালালচক্রের ফাঁদে পড়েছেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করছে এই চক্রটি।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং অন্যান্য নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com