আশরাফুল ইসলাম জয়:
সিরাজগঞ্জের বহুলী ইউনিয়নের চাঁদপাল গ্রামে চাঞ্চল্যকর আশরাফ আলী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘ দশ বছর পর, আজ বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ইকবাল হোসেন এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চার আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অপর দুই আসামিকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একইসাথে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুইজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এই রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে নিহত আশরাফ আলীর পরিবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছে।
আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসামি আঃ আলিম শেখ, মোঃ আবু বক্কার, মোজাম শেখ এবং আঃ রউফকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। পাশাপাশি তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া, ঘটনা চলাকালে মারামারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আসামি আব্দুল্লাহ ও মোস্তাফিজুর রহমানকে পেনাল কোডের ৩২৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিচারকালীন হাজতবাসের সময়কাল মোট সাজা থেকে বাদ যাবে।
মামলার অপর দুই আসামি আমির হামজা শেখ ও মোছাঃ লিলি খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করেন।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিচারক তাদের সাজা কার্যকর করার জন্য অবিলম্বে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সকালে সিরাজগঞ্জের বহুলী ইউনিয়নের চাঁদপাল গ্রামে একটি রাস্তা সম্প্রসারণ ও মাদ্রাসার দেয়াল ভাঙাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়। রাস্তা নির্মাণ কাজের ঠিকাদারের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ভিকটিম আশরাফ আলী।
ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে তিনি কাজ তদারকি করতে গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আসামিরা তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। আসামিরা লাঠি, ছোরা, এবং লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এ সময় তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে আনোয়ার হোসেন তালুকদার নামে আরেক ব্যক্তিকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় আশরাফ আলীকে প্রথমে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করলে, মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিহতের নাতি সুমন বলেন, আমরা দীর্ঘ দশ বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছি। আমার দাদাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আজকের রায়ে আমরা আংশিকভাবে সন্তুষ্ট। আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আশা করেছিলাম, কিন্তু আদালত যা রায় দিয়েছেন তাকে আমরা সম্মান জানাই। আমরা চাই এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর হয়।
সিরাজগঞ্জের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শাকিল মোহাম্মদ শরিফুর হায়দার রফিক সরকার বলেন, এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আদালত একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি বার্তা পৌঁছাবে যে, অপরাধ করে কেউ পার পায় না। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং এটি দ্রুত কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আদালত মামলার জব্দকৃত আলামত বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন এবং আসামিদের জামিনদাতাদের দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন। রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রেরণের জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।