বিশেষ প্রতিনিধি:
কে স্পষ্ট করবে যে, এগুলো বৈধ না অবৈধ? চার লেনের মহাসড়কের পাশের লেনে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, এমনকি ভূটভূটির মতো তিন চাকার যানগুলোকে তারা বৈধ না অবৈধ হিসেবে গণ্য করবে, তা খোদ মহাসড়ক পুলিশও জানে না।
আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের বৈধতা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান এবং এমনকি নসিমন, করিমন ও ভূটভূটির মতো হাজার হাজার লাইসেন্সবিহীন তিন চাকার যান এখন দেশজুড়ে চার লেনের মহাসড়কের পাশের লেনগুলো যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে, যার ফলে প্রায়শই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
কখনও কখনও, এগুলো বিভিন্ন দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য মহাসড়কের মূল লেন ব্যবহার করছে। ফলস্বরূপ, মহাসড়কের পার্শ্বলেন এবং এমনকি মূললেনে এই লাইসেন্সবিহীন যানবাহনগুলোর চলাচল যাত্রী এবং দূরপাল্লার যানবাহনের চালকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
দেশের অন্যান্য অংশের মতো সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলাতেও হাইওয়ে পুলিশের পরোক্ষ সম্মতিতে চারলেনের মহাসড়কের পার্শ্বলেনে সিএনজি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, ভ্যান এবং এমনকি ভুতুড়ে যানবাহন ভুটভুটিসহ হাজার হাজার অননুমোদিত তিন চাকার যান চলাচল করছে, কারণ এই ধরনের যানবাহনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে তিন চাকার গাড়ির চালকরা বিভিন্ন স্থানে প্রায় মহাসড়কের মূল লেনে উঠে পড়ছে, যার ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে, কিছু অসাধু ট্রাফিক পুলিশ, যারা মূলত মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করেন, তারা বিভিন্ন খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে এই ধরনের যানবাহন থেকে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, এই সুযোগ ব্যবহার করে অনেকেই কোটিপতি হয়ে যাচ্ছেন।
কোনো নিয়ম বা নীতি না থাকার সুযোগ নিয়ে যানবাহন থেকে টোল আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে।
একই অভিযোগে ঈদুল আজহার আগে থানা থেকে পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে বগুড়া সার্কেল অফিসে বদলি করা হয়েছিল। তবে, এই সমস্ত অবৈধ কার্যকলাপের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিবেচিত ওসি ইসমাইলের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইসমাইল হোসেন এসআই আরব আলীসহ তার সহযোগীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের যানবাহনগুলোকে হাইওয়ের লেন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টোল আদায় করে আসছেন। এর বিনিময়ে হাইওয়ের কোনো লেনে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ভ্যান দেখা গেলে তিনি বা তার নিয়োগ করা লোক প্রতিদিন প্রতিটি থেকে ৫০ টাকা করে আদায় করেন। এছাড়া, হাইওয়ে পুলিশ রাতে সবজি বোঝাই ট্রাক থেকেও টোল আদায়ে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, সিরাজগঞ্জ জেলার নয়টি উপজেলায় ৪০,০০০-এরও বেশি সিএনজি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫,০০০-এর কোনো লাইসেন্স নেই, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার কারণে প্রায় ৫,০০০ অটোরিকশা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স নিয়ে জেলার বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে চলাচল করছে। তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া এক তথ্যে জানা গেছে, বিআরটিএ-তে ২০১৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কোন সিএনজি’র সাইসেন্স বা নিবন্ধন হয়নি। অথচ, প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন সড়কে নামছে নতুন নতুন সিএনজি চালিত অটোরিক্সা।
জানা যায়, মোট সিএনজি চালিত অটোরিকশার প্রায় ৫০ শতাংশ প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী বা অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য চার লেনের মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে থাকে। সংশ্লিষ্ট চালক ও শ্রমিক সমিতির নেতারা অনুমোদিত টোকেন হিসেবে ছাপানো স্টিকার প্রদানের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রতিটি লাইসেন্সবিহীন সিএনজি (অটোরিকশা) থেকে ৫০০ টাকা এবং প্রতিটি মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সের সিএনজি থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় করেন। এভাবে সমিতির নেতারা প্রতি মাসে গড়ে ১.৯০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন।
অভিযোগ রয়েছে যে, সিএনজি চালিত অটোরিকশা থেকে সংগৃহীত অর্থের প্রায় ৩০ শতাংশ ডিসি অফিস ও বিআরটিএ অফিসের কিছু কর্মকর্তার পকেটে যায়, আর বাকি ৫০ শতাংশ যায় জেলার ট্রাফিক ও বিভিন্ন থানা পুলিশের পকেটে। যদিও আগে আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত নেতা ও কর্মীরা সমিতিটি চালাতো এবং টোলের টাকা সংগ্রহ ও বিতরণ করতো, জানা গেছে যে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপি নেতা ও কর্মীদের হাতে চলে গেছে।
যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, “এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, চার লেনের মহাসড়কের পাশের লেনগুলোতে চলাচলকারী তিন চাকার যানবাহন, বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলোকে বৈধ বলা হবে নাকি অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হবে? এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি। তবে মহাসড়ক বা পার্শ্ব রাস্তায় এধরনের যানবাহন কখনোই কাম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, “আগে চার লেন ছিল না। তাছাড়া, এত বেশি ব্যাটারিচালিত যানবাহনও ছিল না। তাই তখন আইন বা নির্দেশনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন নিয়মিত রাস্তায় নতুন যানবাহন আসছে, প্রতি বছর নতুন বহু-লেনের রাস্তা ও মহাসড়ক তৈরি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রমের জন্য নতুন আইন বা নীতিমালা বা নির্দেশনা অবশ্যই প্রয়োজন।”
বগুড়া সার্কেলের হাইওয়ে পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট আবু তোরাব মো. শামসুর রহমান বলেন, “আসলে মহাসড়কে এগুলো চালানো বৈধ না অবৈধ, তা বলার মতো কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই।” তবে এই ধরনের অনিবন্ধিত ঝুঁকিপূর্ণ তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা যে হারে ক্রমাগত বাড়ছে এবং মহাসড়কে চলাচল শুরু করছে, তা নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। তবে জনস্বার্থে আমরা এই যানবাহনগুলোকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য মহাসড়কের পার্শ্ব লেনগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু, এই ধরনের লাইসেন্সবিহীন যানবাহনের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশনা বা নীতিমালা জরুরিভাবে প্রয়োজন।”
সিরাজগঞ্জ বিআরটিএ অফিসের সহকারী পরিচালক আবু নাইমও একই মত প্রকাশ করে বলেন, “আমরা শুধু ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের নিবন্ধন করি। তাই, ব্যাটারিচালিত যানবাহন সম্পর্কে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই।”