বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৭:৩১ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সরকার বরাদ্দ দেয় সুরক্ষার জন্য, বালুদস্যুরা গ্রাস করে পৈতৃক সম্পত্তির মতো..! হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে, ১৬ই ডিসেম্বর উদ্বোধনের সম্ভাবনা নির্বাহী প্রকৌশলীর কেরামতি, দুর্নীতি ধুয়ে ৭ দিনেই ‘পবিত্র’ সিরাজগঞ্জে ডিপিএইচই-এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট: সময় ও খরচ বেড়েছে, অগ্রগতি আটকে আছে একই জায়গায় ‘এক কোটি ২৮ লাখ তো নিছেন আপনারা সবাই’, সেই অডিওতে ফেঁসে গেছেন পুলিশ কর্মকর্তা ডিপিএইচই: অবশেষে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে পিডি তবিবর সাময়িক বরখাস্ত সারা দেশে ইন্টারনেট নিয়ে দুঃসংবাদ দিল বিএসসিসিএল শজনে ভেবে লাজনা খাচ্ছেন কি? দুটির পার্থক্য জেনে রাখুন অস্তিত্ব হারাতে বসেছে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯: বঞ্চিত তথ্য প্রত্যাশীরা হতাশ রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউর অপেক্ষায় এক মাসে ৯১ শিশুর মৃত্যু

কাঁকড়া আহরণ: সুন্দরবনে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো সুব্রতের স্ত্রী চান না তার সন্তান এ পেশায় থাকুক

  • আপডেট সময় রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৬.১৪ পিএম
মুন্নী খাঁ ওরফে মুন (২৫)


হোসনেয়ারা পারভীন খুকু, খুলনা॥



বৈধ পাস পারমিট (অনুমতি) নিয়ে সংরক্ষিত সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনা জেলার দাকোপ থানার করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো সুব্রত মণ্ডল (৩২) এর স্ত্রী মুন্নী খাঁ ওরফে মুন (২৫) গত ২০ মার্চ, ২০২৬ রাতে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

সুব্রত মণ্ডল (৩২)

মুন্নী জানান, সুব্রত মণ্ডল (৩২) খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার কুমুদ মণ্ডলের ছেলে। মুন্নীর নানাবাড়ীও একই এলাকায়। গত বছর (২০২৫) সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন সকালে বাড়ী থেকে বের হন সুব্রত। ঘরে তখন টাকার টানাটানি, মুন্নী অসুস্থ, তবু কাঁকড়া ধরতে বনে যেতেই হয়েছিল তাকে। নবজাতককে নিয়ে মুন্নী নিজের নানী অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতেই আছেন। স্বামী সুব্রত মন্ডলের মৃত্যুর পর থেকে নানীর বাড়িতেই থাকছেন তিনি।

মুন্নী বলেন, আমার শ্বশুরও ছোটবেলা থেকেই ’জঙ্গল’ করতেন। তিনি বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পর আমার স্বামী ’জঙ্গলে’ যেতেন। সুব্রতের ছোট অন্য তিন ভাইয়ের একজন বিদেশে গেলেও অন্য দুই জন ’জঙ্গল’ করেন। ’জঙ্গল’ সব সময়ই বিপদসংকুল। আমি চাই না, আমার সন্তান বাদাবনে যাক; সে লেখাপড়া শিখুক। বাপ-দাদার পেশায় না আসুক।

সেদিনও অন্য দিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন সুব্রত। সুব্রতদের বাড়ি থেকে সুন্দরবনের করমজল খালের দূরত্ব খুব বেশি নয়, দুই কিলোমিটারের মতো। ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমির আক্রমণ করে তাকে। প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মুন্নী বলেন, স্বামীর মৃত্যুর সময় তিনি প্রায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। গেল ঈদের আগের দিন ২০ মার্চ শুক্রবার দুপুরে প্রসবব্যথা উঠলে প্রথমে তাকে মোংলায় ও পরে চিকিৎসকের পরামর্শে খুলনায় নেওয়া হয়। সেখানে দিবাগত রাতে তিনি একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। ২৩ মার্চ ছেলেকে নিয়ে নানী অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতেই ফিরেছেন। তিনি এবং নবজাতক দুজনেই সুস্থ আছেন।

অনেকটা কান্না জড়িত কন্ঠে মুন্নী বলেন, সাত বছরের অপেক্ষার পর ঘরে সন্তান এল। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দের এই সংবাদ যার সবচেয়ে আগে শোনার কথা, তিনি এখন আর পৃথিবীতে নেই। আমার ছেলেটাও ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। তবে আমার শাশুড়ি বামনী মণ্ডল এসে সন্তানকে দেখে গেছেন।

মুন্নী বলেন, ভালোবেসেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। দু’জনের দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় প্রথম দিকে এই বিয়ে সহজে মেনে নেয়নি কেউ। দুই বছরের বেশি সময় শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ পাননি মুন্নী। পরে ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু বিধি বাম; সংসার স্বাভাবিক হওয়ার পর কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান সুব্রত। তবে সুব্রতের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে ওর বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রেখেছি শুভজিৎ।

মুন্নী আরও বলেন, তার পুরো জীবনটাই কষ্টের। তার যখন আট মাস বয়স, তখন তার বাবা তাকে ও তার মাকে রেখে চলে যান। পরে তার বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর তার মা আবার বিয়ে করেন। তিনি বড় হয়েছেন নানীর কাছে। তার নানী অপর্ণা পাটোয়ারী একটি চায়ের দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালান। তার সামনে এখন বড় চিন্তা-স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ, আর ছেলের ভবিষ্যৎ।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বৈধ পাস নিয়ে কাকড়া আহরণ করতে গিয়ে কুমিরের আক্রমণে নিহত হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে ঐ বনজীবী পরিবারকে ১৫ মার্চ, ২০২৬ তিন লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক দেয়া হয়েছে। তবে বৈধ পাস পারমিট (অনুমতি) ছাড়া কেউ সুন্দরবনে প্রবেশ করে দুর্ঘটনায় পড়লে তার পরিবার ওই সহায়তা পায় না।

সুন্দরবন একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির বলেন, জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ-কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্ত্রী’রা সুন্দরবন-লাগোয়া জনপদের অসংখ্য গ্রামে অপয়া, অলক্ষ্মী অপবাদ নিয়ে সমাজে চরম অবহেলিত জীবন যাপন করছেন। নিদারুণ কষ্টে চলে তাদের পরিবার।

প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির আরো বলেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার সুন্দরবন-লাগোয়া গ্রামগুলোর পুরুষরা বংশপরম্পরা সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণের কাজ করেন। আর নারী ও শিশুরা ব্যস্ত থাকেন কাঠ সংগ্রহ ও চিংড়ির পোনা ধরার কাজে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ আঁকড়ে ধরে আছেন। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনপ্রবাহের সাথে সুন্দরবন আবতিত আবহমান কাল থেকে। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা সংকট আর ঝুঁকি বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল একাধিক পেশাজীবী জানান, সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীতে বর্তমানে মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বনের মধ্যে মৌচাকের দেখা মিলছে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কম। আর সাম্প্রতিক সময়ে বনে প্রবেশ, গোলপাতা আহরণ ও নদী-খালে মাছ-কাঁকড়া ধরতে বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। সাথে রয়েছে বনদস্যু ও বাঘ-কুমিরের ঝুঁকি। এসব কারণে কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যাচ্ছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৩টি বড় নদীসহ ৪৫০টির মতো নদী-খাল রয়েছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। আর বাগেরহাট ও খুলনার সামান্য অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
© All rights reserved © 2023 The Daily Sky
Theme Developed BY ThemesBazar.Com